গুমের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ডা: শফিকের

Printed Edition
গুমের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ডা: শফিকের
গুমের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ডা: শফিকের

নিজস্ব প্রতিবেদক

আজ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান গতকাল এক বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে তিনি গুমের মতো জঘন্য অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের অবিলম্বে উদ্ধার করে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া এবং এ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য বর্তমান সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।

বিবৃতিতে আমিরে জামায়াত বলেন, ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী ৩০ আগস্ট ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। আজকের এই দিনে আমরা গুমের শিকার নিরপরাধ ব্যক্তিদের গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি এবং তাদের শোকার্ত ও প্রতীক্ষারত পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছি। প্রিয়জন হারানোর নির্মম যন্ত্রণা কতটা দুঃসহ, তা ভুক্তভোগী পরিবার ছাড়া অন্য কারো পক্ষে পুরোপুরি অনুধাবন করা সম্ভব নয়। বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও প্রিয় মানুষের সন্ধান না পেয়ে অগণিত পরিবার আজও গভীর মানসিক ট্রমা ও মানবিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে; অনেক পরিবার সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে পড়েছে।

গুম হওয়া ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট উদাহরণ তুলে ধরে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ আট বছরের অবর্ণনীয় বন্দিদশা ও গুম থাকার পর সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান আহমদ বিন কাসেম ফিরে এলেও, জামায়াত নেতা হাফেজ জাকির হোসাইন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিবির নেতা আল মোকাদ্দাস ও মোহাম্মদ ওলিউল্লাহ, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও সাবেক কমিশনার চৌধুরী আলমসহ বহু নিখোঁজ ব্যক্তি আজও ফিরে আসেননি। তাদের ভাগ্য এখনো অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঝুলছে।

তিনি আরো বলেন, গুম প্রতিরোধ ও গুমের সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণয়ন করেছিল; কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর নবগঠিত সরকার অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করতে অস্বীকৃতি জানায়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, অধ্যাদেশটির বিভিন্ন বিধানে অসঙ্গতি রয়েছে। তাই এগুলো অনুমোদন না করে সরকার বলেছে, স্টেকহোল্ডারদের সাথে অধিকতর পরামর্শ ও যাচাইবাছাইক্রমে ভবিষ্যতে আরো বাস্তবসম্মত ও কার্যকর আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেবে। ফলস্বরূপ সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের ৩০ দিন পরে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫-এর কার্যকারিতা লোপ পায়। সরকার পরবর্তী সময়ে ওই অধ্যাদেশটিতে কিছু পরিবর্তন এনে নতুন খসড়া বিল প্রণয়ন করেছে; কিন্তু ওই খসড়া বিলে আইনটি প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্যকেই অকার্যকর করে দেয়া হচ্ছে। নতুন খসড়া বিলে গুমসংক্রান্ত আইনের সংজ্ঞাসহ বিভিন্ন ধারায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো গুমের মতো গুরুতর অপরাধ, যা সাধারণত শৃঙ্খলাবাহিনীর মাধ্যমে সংঘটিত হয়, তার অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের ক্ষমতা পুলিশকে দেয়া হয়েছে। তদন্তের জন্য ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণের কথা বলা হয়েছে; কিন্তু গুম একটি বিশেষ ধরনের অপরাধ যার মোকাবেলায় বিশেষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত কোনো অপরাধের তদন্তভার পুনরায় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হাতেই তুলে দেয়া একটি অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত। তা ছাড়া গুমসংক্রান্ত তথ্যভাণ্ডার তত্ত্বাবধানের দায়িত্বও সরকারের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রে গুমের ঘটনার সাথে সরকার নিজেই সম্পৃক্ত থাকে। তাই সরকারের অধীনে এই তথ্যভাণ্ডার কতটা নিরপেক্ষভাবে সংরক্ষিত হবে এবং জনগণের সামনে গুমের সঠিক তথ্য প্রকাশ পাবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে।

বিবৃতির শেষাংশে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আমরা প্রত্যাশা করি, বর্তমান সরকার এই মানবিক সঙ্কট নিরসনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। নিখোঁজ ও গুম হওয়া সব নাগরিককে দ্রুত সময়ের মধ্যে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। পাশাপাশি গুমের মতো জঘন্য অপরাধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সব ব্যক্তি ও মাস্টারমাইন্ডকে বিচারে আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। আমরা আরো প্রত্যাশা করি যে, সরকার সব প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিকরণের মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসবে। জনগণের মৌলিক অধিকারের কথা চিন্তা করবে। জনগণের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুমকে একটি বিশেষ অপরাধ হিসেবে পূর্ণ স্বীকৃতি দেবে। একই সাথে এই বিশেষ ধরনের অপরাধের সঠিক অনুসন্ধান, সুষ্ঠু তদন্ত এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের জন্য একটি বিশেষ ও স্বাধীন আইনি কাঠামো গঠনে উদ্যোগ নেবে।