মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, ভালুকা (ময়মনসিংহ) থেকে ফিরে
ময়মনসিংহের ভালুকায় ‘বাউন্ডারি’ পরিবারের হাতে জিম্মি সাধারণ মানুষ আর বন বিভাগ। এবার পরিবারটির টার্গেট জনপ্রতিনিধি হওয়া। সরকারের এক প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে পরিবারের সদস্য মামুন দলীয় মনোনয়ন পেতে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কাছে লবিং-তদবির শুরু করেছেন। যা নিয়ে এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্র মতে, ভালুকা দেশের প্রথম মডেল থানা এবং দেশের অন্যতম বিসিক শিল্প নগরী। এটি সারা বাংলাদেশের সব কয়টি উপজেলাকে পেছনে ফেলে এক নাম্বারে উঠে এসেছে। অসংখ্য টেক্সটাইল মিলস, ঔষধ কারখানা, কুমির খামার, সিরামিক শিল্প, স্পিনিং মিলস, কোমল পানীয় কারখানা, ভারী শিল্প ও আন্তর্জাতিক মানের পোশাক শিল্পাঞ্চল। এ ছাড়া এই উপজেলাজুড়ে রয়েছে বিশাল বনভূমি।
সরকারি হিসেবে মোট বনভূমি ২৩০৭৮.২৬ একর। এখানকার জায়গার দাম আকাশচুম্বি। সফলতার ক্ষেত্র যেমন বিশাল তেমনি করুণ পরিণতিও ভোগ করতে হচ্ছে এই উপজেলাকে। সোনার চেয়ে দামি হওয়ায় এখানকার জমির দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন ভূমিদস্যুরা। প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে বনাঞ্চল। অবৈধভাবে গড়ে উঠছে শিল্প কারখানা। বিশেষ করে রাজনৈতিক সরকারের সময়ে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নিয়মে চলে দখলবাণিজ্য। আগের ধারাবাহিকতায় আবার দখল হচ্ছে ভালুকার বনাঞ্চল।
স্থানীয়রা জানান, সেই লোলুপ দৃষ্টিতে আবারো দখলে মেতে উঠেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা শহীদ। আর এর পেছনে চলছে কোটি কোটি টাকার লেনদেন। শহীদ পরিবারের টাকা ও প্রতিপত্তির কাছে আইনশৃঙ্খলাসহ বন বিভাগের লোকজনও অসহায়। অনেকে ভয়ে, আবার কেউ কেউ আখের গোছাতে নিজেকে সঁপে দিচ্ছেন তার হাতে।
পুরো নাম শহীদুল ইসলাম শহীদ। জন্মসূত্রে গফরগাঁওয়ের বাসিন্দা হলেও হবিরবাড়ি মৌজায় স্থানান্তরিত হয়ে এখানেই স্থায়ী হন। তিনি ভালুকা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। বন দখলসহ নানা অভিযোগ উঠায় দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এলাকাবাসী তাকে ‘বাউন্ডারি শহীদ’ নামেই জানেন। অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের জমি দখল করতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। যখনই জায়গা দখলের প্রসঙ্গ আসে, তখনই তিনি জমিতে বাউন্ডারি দিয়ে দেন। এরপরই তার পরিচয় হয়ে যায় বাউন্ডারি শহীদ নামে। শুধু নিজের নয়, অর্থের বিনিময়ে অন্যকেও বাউন্ডারি দিয়ে জমি দখলে নিয়ে দিতেন বিএনপির সাবেক নেতা শহীদ।
স্থানীয়রা জানান, এখন সেই দখলের কাজটি বাবার সাথে করছেন দুই ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান মামুন ও মাহমুদুল হাসান মুরাদ। মামুন স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির ১নং সদস্য। বাবার মতো ছেলের নামও হয়ে গেছে বাউন্ডারি মামুন।
জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেন মামুন। কিন্তু বিতর্কের কারণে মনোনয়ন পাননি। এখন তিনি আসন্ন উপজেলা নির্বাচন করার ইচ্ছা পোষণ করে দৌড়ঝাঁপ করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহীদের বিরুদ্ধে ময়মনসিংহের ভালুকা মডেল থানায় চাঁদাবাজি, মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ একাধিক মামলা রয়েছে। অস্ত্র আইনের একটি মামলা রয়েছে। ভালুকা মডেল থানায় ও নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লা থানা মিলে ১২টি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া তার ছেলে মামুনের বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক মামলা। অপর ছেলে মাহমুদুল হাসান মুরাদের নামেও রয়েছে একাধিক মামলা।
এলাকাবাসী জানান, বন বিভাগের নার্সারিতে কাজ করতেন বাউন্ডারি শহীদ। এখন তিনি শত শত কোটি টাকার মালিক। ভালুকা রেঞ্জসংলগ্ন এলাকায় আলিশান বাড়ি, রয়েছে একাধিক খামার ও শিল্প কারখানা। সিডস্টোর বাজারের পূর্বদিকে ২০ বিঘা জমিতে রয়েছে সুপ্তি সোয়েটার ও সুপ্তি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, দক্ষিণ দিকে ১০ বিঘা জমির উপর সুপ্তি ওয়েল লিমিটেড। কোকাকোলার পশ্চিমে সাত বিঘা জমির উপর হাজী এন্টারপ্রাইজ নামে আরসিসি পিলারের কারখানা। জনশ্রুতি আছে ঢাকাতেও তার রয়েছে একাধিক বাড়ি।
এলাকাবাসী জানান, ভালুকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবিরবাড়ি বিটের প্রায় সাত হাজার ১০ একর জমির মধ্যে চার হাজার ১৪৪ একর জমি শহীদদের ভোগে, কাদিগড় বিটের চার হাজার ৬৮৬ একর জমির মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জমি অর্থাৎ তিন হাজার ৬০ একর জমি অবৈধ দখলদারদের কবলে চলে গেছে। ভালুকার বাসিন্দাদের দাবি, ২০০০ সালে ভালুকা থানার শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় উঠেছিল শহীদের নাম। কিন্তু কালের আবর্তে হারিয়ে গেছে সব কিছু। সেখানে এসেছে এখন তার ছেলে মামুনের নাম। বনের জমি দখলের পেছনে প্রায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তিনি যুক্ত থাকলেও সংশ্লিষ্টরা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের এড়িয়ে গেছেন। কোনো মামলায় নাম ভুল, কোনো মামলায় পিতার নাম ভুল, আবার কোনো মামলায় ঠিকানা ভুল দেয়া হয়েছে। কখনো জমির দাগ নম্বরে ভুল করে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। তিনি থেকেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
জানতে চাইলে ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নুরুল করিম দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, যারা বনাঞ্চল দখলের সাথে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াটা সহজ নয়। তবে সরকার ও রাষ্ট্র চাইলে সবই সম্ভব। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যেখানে ২৫ কোটি গাছ রোপণের ঘোষণা দিয়েছেন সেখানে রাজনৈতিক পরিচয় বা অন্য পরিচয়ে বনাঞ্চল দখলে নিয়ে গাছ কাটার বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনে আলোচনা চলছে। শিগগির অবৈধ দখলকৃত বনাঞ্চল উদ্ধারে কাজ শুরু হবে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও শহীদ ফোন রিসিভ করেননি। তার ছেলে মামুন বলেন, আমি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচন করতে চাওয়ায় আমার নিজ দলের প্রতিপক্ষ আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে বিষোদগারে নেমেছে। মিডিয়ায় মিথ্যা তথ্য দিয়ে আমাদের হয়রানি ও মানহাানি করাচ্ছে।



