গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উপস্থাপিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সুস্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে। ইশতেহারের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের ধসে পড়া অর্থনীতি পুনর্গঠন ও জনকল্যাণমুখী উদ্যোগের বাস্তবায়ন। যদিও অর্থমন্ত্রী একাধিকবার বলেছেন, অর্থনৈতিকভাবে খারাপ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য এবারের বাজেটে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন করা হবে। বাস্তবে প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণায় এসবের প্রতিফলন দেখা গেছে।
সূত্র মতে, নির্বাচনের আগে বিএনপি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা, কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষিবীমা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণ, ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলা, পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে ১০ হাজার কিলোমিটার নদী-খালখনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ১৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু, সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু, ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন ও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রফতানি সম্প্রসারণ ইত্যাদি।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর এটি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নবগঠিত বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট। দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরে বিএনপির প্রথম বাজেটকে কেন্দ্র করে স্বভাবতই সাধারণ মানুষ, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহল ও উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে দুই লাখ ৭৯ হাজার এক কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের ২৯.৭৪%), ভৌত অবকাঠামো খাতে এক লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা (১৮.৬৬%), সাধারণ সেবা খাতে দুই লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা (২৬.১৩%) বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে উদ্যোক্তা উন্নয়ন ফান্ডে ২২৫ কোটি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে দুই হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে ছিল। এ ছাড়াও শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণে আধুনিকায়ন, স্টার্ট-আপ ফান্ড এবং তরুণদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ ও আইটি পার্কে ফ্রি ওয়াই-ফাইয়ের প্রতিশ্রুতি বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে করমুক্ত রাখা, স্থানীয় ও রফতানিমুখী শিল্পে প্রণোদনা এবং মহিলা উদ্যোক্তাদের করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর মতো ইশতেহারের ইতিবাচক বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়েছে।
বাজেটে নির্বাচনী ইশতেহারকে সামনে রেখে অঙ্গীকার অনুযায়ী উৎপাদনশীল খাতের প্রসার ঘটিয়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। বেকারত্ব দূরীকরণ এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে বাজেটে ২২৫ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল রাখা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের দ্রুত বিকাশ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুবিধার জন্য রাখা হয়েছে দুই হাজার কোটি টাকার বিশাল বিশেষ তহবিল। এ ছাড়া তরুণ আইটি পেশাদার ও ফ্রিল্যান্সারদের বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য বিশেষ ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং দেশের বড় বড় আইটি পার্কগুলোতে বিনামূল্যে হাই-স্পিড ওয়াই-ফাই সেবা প্রদানের অর্থনৈতিক সংস্থান বাজেটে রাখা হয়েছে। ইশতেহারে বিএনপি ঘোষণা করেছিল যে, তারা ক্ষমতায় গেলে শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশের কাছাকাছি বরাদ্দ নিয়ে যাবে। এই প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রথম ধাপ হিসেবে বাজেটে শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা খাতে প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের জন্য বিশেষ প্যাকেজ বাজেটে এক বিশেষ মানবিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন ঘটেছে। শহীদ পরিবারগুলোর জন্য মাসিক ২০ হাজার টাকা এবং আহতদের আঘাতের তীব্রতা অনুযায়ী এ, বি ও সি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করে যথাক্রমে ২০ হাজার, ১৫ হাজার ও ১০ হাজার টাকা করে মাসিক কল্যাণ ভাতা প্রদানের আইনি ও অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য এ বাজেট শুধু আর্থিক পরিকল্পনাই নয়; বরং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবেও বিবেচিত হবে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান নয়া দিগন্তকে বলেন, বিএনপি একটি ভঙ্গুর অর্থনীতিক অবস্থার মধ্যে ক্ষমতায় এসেছে। আমরা নির্বাচনের আগে বলেছিলাম এই অবস্থার পরিবর্তন করব। দেশের প্রান্তিক মানুষের কথা চিন্তা করে অনেকগুলো প্রতিশ্রুতি আমরা দিয়েছিলাম। প্রস্তাবিত বাজেটে সেই প্রতিশ্রুতির ফলন ঘটেছে।



