- মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চিনিগুঁড়ার পোলাও-বিরিয়ানি
- মোটা ডাল ও খোলা ময়দার দামও ঊর্ধ্বমুখী
দেশের চালের বাজারে আবারো অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সুগন্ধি ও চিকন চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে পোলাও-বিরিয়ানির প্রধান উপকরণ চিনিগুঁড়া চাল। ব্যবসায়ী ও বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি, সুগন্ধি চাল রফতানির অনুমতি, করপোরেট পর্যায়ে ধান-চাল মজুদ এবং সরবরাহ সঙ্কট এই তিন কারণেই বাজারে দাম বেড়েছে। তবে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গত মে মাসের এক আদেশ অনুযায়ী, ২১১টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৩৬ হাজার টনের বেশি সুগন্ধি চাল রফতানির অনুমতি দেয়া হয়। এরপর থেকেই বাজারে চিনিগুঁড়া চালের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
বাজার ঘুরে ও ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক মাস আগেও ৫০ কেজির একটি বস্তা চিনিগুঁড়া চালের দাম ছিল প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। বর্তমানে একই বস্তা বিক্রি হচ্ছে আট হাজার ৬০০ থেকে আট হাজার ৭০০ টাকায়। অর্থাৎ বস্তাপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় তিন হাজার ৭০০ টাকা। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চিনিগুঁড়া চাল বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায়, যা আগে ছিল প্রায় ১১০ টাকা।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, রফতানির জন্য বিপুল পরিমাণ সুগন্ধি চাল সংগ্রহ করায় বাজারে বিকল্প হিসেবে কাটারি, নাজিরশাইল, মিনিকেটসহ অন্যান্য চিকন চালের চাহিদাও বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পুরো চিকন চালের বাজারে। ফলে বিয়ে, দাওয়াত কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় চাল কিনতে বাড়তি ব্যয় গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
চট্টগ্রামের বড় চালব্যবসায়ী ওমর আজম বলেন, সরকার সুগন্ধি চাল রফতানির অনুমতি দেয়ার পর ভালো মানের চালের দাম দ্রুত বেড়েছে। তার ভাষায়, বর্তমানে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ধান সংগ্রহে বড় ভূমিকা রাখছে। তারা বেশি দামে বিপুল পরিমাণ ধান কিনে নেয়ায় ছোট ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না, যা বাজারে দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী আবদুল হান্নান বলেন, হাওর অঞ্চলের বন্যায় কিছু ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সুগন্ধি চাল রফতানির কারণে কাটারি ও নাজিরশাইলের মতো চিকন চালের চাহিদা বেড়েছে। তবে তিনি দাবি করেন, মোটা চালের বাজার এখনো তুলনামূলক স্থিতিশীল। বাজারসংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে ২৫ কেজির কাটারি চাল দুই হাজার ২৫০ থেকে দুই হাজার ৩০০ টাকা এবং নাজিরশাইল দুই হাজার ২৮০ টাকার কাছাকাছি দামে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে এসব চালের দাম প্রতি কেজি ৯০ থেকে ৯৫ টাকার মধ্যে।
অন্য দিকে উত্তরাঞ্চলে এবার বোরো ধানের ভালো উৎপাদন হলেও তার সুফল ভোক্তারা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। কৃষকপর্যায়ে ধানের দাম তুলনামূলক কম থাকলেও চালের খুচরা বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন, মজুদ, মিলিং ও বিপণন- সব পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি না থাকলে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি হওয়ার সুযোগ থেকে যায়।
ডাল ব্যবসায়ও সিন্ডিকেট কাজ করে?
ডালের ব্যবসায়ও সিন্ডিকেট কাজ করে এমন তথ্য মিলেছে। ব্যবসায়ীদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, রাজশাহীকেন্দ্রিক একটি সিন্ডিকেট মোটা মসুর ডালকে পলিশ করে চিকন করছে এবং তা মাঝারি সাইজের ডাল হিসেবে বিক্রি করছে। ফলে মোটা ডালের বাজার বেড়ে যাচ্ছে। মুগডালের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা বলে সূত্রের দাবি।
চট্টগ্রামের একাধিক ডাল ব্যবসায়ী নয়া দিগন্তকে বলেন, মোটা মসুর ডাল এবং মুগডালের বাজার এখন ঊর্ধ্বমুখী। পাইকারি বাজারেই মোটা মুগডাল কেজিতে ২৫ টাকা বেড়েছে বলে সূত্রের। দাবি। গতকাল খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে মসুর ডাল (মোটা) ৭৭ টাকা, মাঝারি ১৩০ টাকা, চিকন (ইন্ডিয়ান) ১৫২ টাকা দরে বিক্রি হয়। মোটা মুগডাল কেজিতে ২৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ১১২ টাকা, রাজশাহী অঞ্চলের চিকন মুগডাল ১৪৫ টাকা, মাঝারি আকারের মুগডাল ১৩৮ টাকা, অ্যাংকর (মটর) ডাল -৪৫ টাকা, চনার ডাল- ৮২ টাকা, খেসারি- ৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল পাইকারি বাজারে।
কিন্তু খুচরা বাজারে দাম বেড়েছে মসুর ডাল, মুগডাল ও অ্যাঙ্কর ডালের। প্রতি কেজি মোটা মসুরডাল ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে। প্রতি মাঝারি আকৃতির মসুর ডাল ১৩৫-১৪০ টাকা এবং চিকন মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে অ্যাঙ্কর ডাল বিক্রি হচ্ছে ৭৫-৮০ টাকা কেজি দরে। চনার ডাল বিক্রি হচ্ছে ১০০-১১০ টাকা কেজি দরে। এ ছাড়া মুগডাল আকার ভেদে ১২০ থেকে ১৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী দিদারুল আলম বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেও মানুষ কি পরিবর্তন হয়েছে? সরকারের শুল্ক ছাড়ের ফলে চালের দাম কমার কথা থাকলেও কমেনি। রফতানির নামে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সারাদেশের সব চিনিগুড়া চাল সংগ্রহ করে নিয়ে বাজারে সরবরাহ সঙ্কট তৈরি করেছে। ফলে প্রতি কেজিতে ৬০-৭০ টাকার ওপরে দাম বেড়েছে, যা নজিরবিহীন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আমদানির কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে এই ব্যবসায়ী বলেন, দাম কমাতে চাইলে আমদানির অনুমতি দিতে বাধ্য সরকার। তিনি বলেন, বড় বড় করপোরেট হাউজগুলো চালের কারখানা স্থাপন করায় এখন কোম্পানিগুলো চাল মজুদ করছে। ফলে চালের বাজারের অধিকাংশ কর্তৃত্ব এখন করপোরেট হাউজের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ছোট ব্যবসায়ীদের হাতে এখন চালের ব্যবসা নেই। তাই আমদানি না করলে দাম কমানো যাবে না।
হঠাৎ বেড়েছে খোলা ময়দার দাম
চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে কোরবানির ঈদের পর থেকে খোলা ময়দার দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে ৫০ কেজির একটি বস্তা ময়দা বিক্রি হচ্ছে প্রায় দুই হাজার ৭০০ টাকায়, যা তিন সপ্তাহ আগে ছিল প্রায় দুই হাজার ২০০ টাকা; অর্থাৎ বস্তাপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ৫০০ টাকা।
আমদানিকারকদের দাবি, ডলার সঙ্কট ও এলসি খোলার জটিলতার কারণে উন্নতমানের কানাডিয়ান গম আমদানি কমে গেছে। ফলে বাজারে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের একাংশের অভিযোগ, সরবরাহ সঙ্কটকে পুঁজি করে কয়েকটি বড় শিল্প গ্রুপ দাম বাড়িয়েছে। বর্তমানে খুচরা বাজারে আটা কেজিপ্রতি ৫২-৫৫ টাকা এবং ময়দা ৬২-৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ভোজ্যতেলের বাজারে স্বস্তি
চাল, ডাল ও ময়দার বাজারে অস্থিরতার মধ্যেও ভোজ্যতেলের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। আমদানিকারকদের মতে, দেশে পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং গত কয়েক দিনে দাম কিছুটা কমেছে।
খুচরা বাজারে খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ১৯৫-২০০ টাকা, সুপার পাম ১৭৬ টাকা এবং পাম তেল ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, চালের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে রফতানি, মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজরদারি প্রয়োজন। একই সাথে প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত তদারকি জোরদার করা হলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।



