পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণ বেড়েছে

প্রস্তাবিত বাজেটকে স্বাগত জানিয়েছে ডিএসই

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

দীর্ঘদিন ধরে ভালো পুঁজিবাজারের প্রত্যাশায় সাইড লাইনে থাকা বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে বাজারে অবস্থান নিয়েছে। ফলে বিগত সপ্তাহে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সপ্তাহিক বাজার বিশ্লেষণে এ তথ্য পাওয়া যায়। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘ সময় ধরে মন্দায় আটকে থাকা পুঁজিবাজার সামনের দিনগুলোতে একটি ভালো অবস্থানে পৌঁছবে এমন ইতিবাচক ধারণা থেকে নতুন করে বিনিয়োগকারীরা বাজারে আসছেন।

গত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে মোট ছয় হাজার ৪৩৮ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয় যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ১১ দশমিক ৪০ শতাংশ বেশি। আগের সপ্তাহে ডিএসইর মোট লেনদেন ছিল চার হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। ৭ জুন সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসেই বাজারটির লেনদেন দেড় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় যা ছিল সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে লেনদেন কিছুটা হ্রাস পেলেও এ সময় ডিএসইর গড় লেনদেন দাঁড়ায় এক হাজার ২৮৭ কোটি টাকা। এর আগের সপ্তাহে ডিএসইর গড় লেনদেন ছিল এক হাজার ১৫৫ কোটি টাকা।

ফেলে আসা সপ্তাহটিতে ডিএসইর লেনদেন বৃদ্ধিতে ভূমিকা ছিল সূচকের। সপ্তাহের মোট ৫ কর্মদিবসের মধ্যে একটিতে সূচক হারালেও চারটিতে বাজারটি সূচকের কমবেশি উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স এ সময় ৪৫ দশমিক ৪০ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। রোববার পাঁচ হাজার ৪৭৫ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার সপ্তাহান্তে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৫২০ দশমিক ৪০ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৪ দশমিক ৫৭ ও ৫ দশমিক ৬৭ পয়েন্ট।

ডিএসইর সপ্তাহিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায় ফেলে আসা সাম্প্রতিক দিনগুলোর চেয়ে গত কয়েকদিন পুঁজিবাজারের লেনদেন একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে ফেরার ইঙ্গিত বহন করছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গত কিছুদিন আগেও পুঁজিবাজারে স্বল্পমূলধনী ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল কোম্পানিগুলোর যে দৌরাত্ম্য ছিল তা থেকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে শুরু করেছে পুঁজিবাজার।

পুঁজিবাজারের প্রকৃত বিনিয়াগকারীদের জন্য এটি একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। গত সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল ব্যাংকিং খাতের এনসিসি ব্যাংক। সপ্তাহের প্রতিদিন গড়ে ২৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয় কোম্পানিটির যা ছিল ডিএসইর মোট লেনদেনের ২ দশমিক ১৬ শতাংশ। গড়ে ২৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকার শেয়ার বেচাকেনা করে প্রকৌশল খাতের ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস ছিল লেনদেনের দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর সপ্তাহিক লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আইপিডিসি, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, আনোয়ার গ্যালভেনাইজিং, জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেড, পিপলস ইন্স্যুরেন্স, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ ও বিডি থাই ফুডস।

ডিএসইতে এ সময় মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান শ্যামপুর সুগার মিলস। গত সপ্তাহে কোম্পানিটির ৪১ দশমিক ২৬ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। আগের সপ্তাহে কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ১৬৯ দশমিক ৪০ টাকা যা গত বৃহস্পতিবার ২৩৮ দশমিক ৯০ টাকার পৌঁছে। একটি বন্ধ ও লোকসানি কোম্পানির এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে ডিএসই কর্তৃপক্ষ কোম্পানিটির লেনদেন ওই দিনের জন্য স্থগিত করে। ২৮ দশমিক ৫২ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া বীমা কোম্পানি মার্কেন্টাইল ইন্স্যুরেন্স ছিল ডিএসইর সপ্তাহিক মূল্যবৃদ্ধির দ্বিতীয় স্থানে। এ সময় বাজারটির মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স, দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, আইপিডিসি, সোনারগাঁও টেক্সটাইলস, সেনা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, দুলামিয়া কটন মিলস ও এসআইবিএল বন্ড।

এদিকে পুঁজিবাজারের বিকাশ ও বিনিয়োগ পরিবেশকে আরো অনুকূল করতে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট গুরুত্ব¡পূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ। ডিএসইর মতে, সরকারের নীতিগত সহায়তা, চলমান সংস্কার কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ধারাবাহিক উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে। একই সাথে এসব পদক্ষেপ বাজারের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তিকে আরো মজবুত করবে।

বৃহস্পতিবার বাজেট পরবর্তী এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রস্তাবিত বাজেটের বিষয়ে নিজেদের মূল্যায়ন তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানটি। বিজ্ঞপ্তিতে বাজেটকে স্বাগত জানিয়ে ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্যে বাজেটে যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তা বাজার আধুনিকায়নের জন্য সময়োপযোগী উদ্যোগ। এর মাধ্যমে বাজার পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং আরো শক্তিশালী অবকাঠামো গড়ে উঠবে।

তিনি আরো বলেন, শেয়ারবাজারের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকারের আন্তরিকতা সাম্প্র্রতিক বিভিন্ন নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর শেয়ারবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী নিয়োগ এবং অর্থমন্ত্রীর বিভিন্ন বক্তব্যে এ খাতকে গুরুত্ব দেয়ার বিষয়টি বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এ ছাড়া এনআইটিএ হিসাব পরিচালনা প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ডিএসই চেয়ারম্যান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তার মতে, এ পদক্ষেপ দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি বাজারের পরিধি ও গভীরতা বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

মমিনুল ইসলাম জানান, বর্তমান টি+২ সেটেলমেন্ট ব্যবস্থার পরিবর্তে ধাপে ধাপে টি+১ এবং পরবর্তীতে টি+০ সেটেলমেন্ট চালুর লক্ষ্যে কাজ করছে ডিএসই। এ ব্যবস্থা চালু হলে লেনদেন নিষ্পত্তি আরো দ্রুত ও নিরাপদ হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকমানের বাজার কাঠামো গড়ে তোলাও সহজ হবে। ডিএসইর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শেয়ারবাজারের প্রতি সরকারের ইতিবাচক মনোভাব এবং চলমান সংস্কার কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে দেশের শেয়ারবাজারকে আরো শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও টেকসই ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করবে।

পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আধুনিক ও স্বচ্ছ শেয়ারবাজার গঠনে প্রতিষ্ঠানটি তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।