মো: আল আমিন, ফজলুল হক রোমান ও মো: হাবিবুল্লাহ
হাওরের আকাশটা যেন এবার একটু বেশিই নিচু হয়ে এসেছে। মেঘ জমে থাকে সারাক্ষণ, আর সেই মেঘ ভেঙে নামা বৃষ্টির পানি গ্রাস করে নিচ্ছে কৃষকের বছরের একমাত্র সম্বল। ক্ষেতের পাকা ধান তলিয়ে গেছে আগেই। যে ধান কেটে আনা হয়েছিল-মাড়াই করে খলায় রাখা হয়েছিল শুকানোর জন্য- সেগুলোর ওপরও উঠেছে পানি। বাড়িতে সযতেœ রাখা ধানে চারা গজাচ্ছে। জমিতে স্তূপ করে রাখা খড় ভেসে গেছে, উঁচু জায়গায় তোলা খড় টানা বৃষ্টিতে পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এ যেন শুধু একটি কৃষি দুর্যোগ নয়- ধীরে ধীরে বিস্তৃত হওয়া একটি মানবিক বিপর্যয়ের গল্প। এই বিপর্যয় আরো ভারী হচ্ছে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কায়।
গতকাল শনিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া ভারী থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত সারা দিন ধরে চলেছে। রোববারও একই ধরনের বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর, আর সোমবার বজ্রঝড়ের আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যেই কিশোরগঞ্জের কালনী, মগড়া ও ধনু-বৌলাই নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। উজান থেকে নেমে আসছে পাহাড়ি ঢল, যা হাওরের মানুষের কাছে আতঙ্কের আরেক নাম। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এটি দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় রূপ নিতে পারে।
চোখের সামনে ভেসে যাওয়া স্বপ্ন
অষ্টগ্রামের হাওর অঞ্চলের কৃষক বরজু মিয়ার কণ্ঠে হতাশার ভার- ‘বৃষ্টি এইবার আগেই শুরু অইয়া গেছে। আমার পাঁচ কানি জমির ধান কাটতে পারি নাই, সব পানির নিচে। চার কানি জমির ধান কাইট্টা খলায় রাখছিলাম- ওইগুলাও পইচা গেছে।’
একই এলাকার কৃষক আব্দুর রহমানের কণ্ঠে অসহায়তার দীর্ঘশ্বাস- ‘ধান তো গেছে গেছেই, হাওরে রাখা খড়ও ভেসে গেছে। সারা বছর উপাস থাকতে হইবো। গরুগুলাও না খাইয়া মরবো।’ তাদের এই কথাগুলো শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির গল্প নয়- এগুলো হাওরের হাজারো কৃষকের সম্মিলিত আর্তনাদ। সাধারণত বৈশাখের প্রথম সপ্তাহেই হাওরে বোরো ধান কাটা শেষ হয়; কিন্তু এবার বৈশাখের শুরু থেকেই টানা বৃষ্টি জমিকে ভিজিয়ে রাখায় ধান পাকতে দেরি হয়েছে। পরে ধান পাকলেও ভারী বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে মাঠে নামতে পারেননি কৃষকরা। ফলে সেই পাকা ধানই এখন পানির নিচে ডুবে আছে।
ক্ষতির বিস্তার : সাত জেলার হাওরাঞ্চল
শুধু কিশোরগঞ্জ নয়- সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায় একই চিত্র। হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় এখন পর্যন্ত ৫৬ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। বাকি জমির প্রায় অর্ধেক ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতোমধ্যে ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শনিবার দুপুর পর্যন্ত ১৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হলেও, বাস্তবে তার প্রভাব ছিল অনেক বেশি। কারণ, এর সাথে যুক্ত হয়েছে উজানের ঢল।
নদীর পানি বাড়ছে, বাড়ছে শঙ্কা
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, কালনী নদীর পানি অষ্টগ্রামে ১৫ সেন্টিমিটার, করিমগঞ্জে মগড়া নদীর পানি ১০ সেন্টিমিটার এবং ইটনায় ধনু-বৌলাই নদীর পানি ৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধি শুধু সংখ্যার হিসাব নয়- এর অর্থ আরো জমি প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি। আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করছেন, বৃষ্টি না কমলে বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুতই দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় পরিণত হতে পারে।
কৃষকের সামনে তিনমুখী সঙ্কট
মাঠে গিয়ে দেখা গেছে, কৃষকরা এখন একসাথে তিনটি বড় সঙ্কটে পড়েছেন- ১. ধান কাটতে না পারা : জমি পানিতে তলিয়ে থাকায় ধান কাটার সুযোগ নেই। ২. শ্রমিক সঙ্কট : যাদের জমি শুকনো, তারাও শ্রমিক পাচ্ছেন না। ৩. শুকানোর সমস্যা : রোদ না থাকায় কাটা ধানও শুকানো যাচ্ছে না।
মিঠামইনের কৃষক হারুন মিয়া বলেন- ‘পানি কমলেও এই ধান কাটন যাইবো না। কাদা জমিতে মেশিন যায় না, লোকও পাই না। ছয়-সাত দিন পানির নিচে থাকলে ধান ভালো থাকে নাকি?’ ইটনার কৃষক হাবিল মিয়ার অবস্থা আরো করুণ। ১১ কানি জমির মধ্যে আট কানি তলিয়ে গেছে, আর বাকি তিন কানি কেটে রাখা ধানও পানিতে নষ্ট। ‘লোক লাগাইয়া খরচ কুলাইতে পারি নাই,’ -বলতে বলতেই থেমে যান তিনি।
খড়ের সঙ্কট : গবাদিপশুও ঝুঁকিতে
ধানের পাশাপাশি খড়ও হারিয়ে ফেলছেন কৃষকরা। ফলে সামনে দেখা দিয়েছে গবাদিপশুর খাদ্যসঙ্কট। মিঠামইনের কৃষি কর্মকর্তা ওবায়দুল ইসলাম খান জানান, হাজার হাজার খড়ের স্তূপ পচে গেছে। এর ফলে কৃষকের জীবনযাত্রা যেমন বিপর্যস্ত হবে, তেমনি গবাদিপশু পালনও হুমকির মুখে পড়বে।
নারী-শিশুরাও নেমেছে সংগ্রামে
নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি উপজেলার এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য যেন এই সঙ্কটের প্রতীক। শ্রমিক না পেয়ে কৃষক শচীন্দ্র দাস তার পরিবারের সবাইকে নিয়ে- স্ত্রী, ভাই, সন্তানসহ- কলাগাছের ভেলা বানিয়ে পানির মধ্যে নেমে ধান কেটেছেন।
তার স্ত্রী সীমা রানী দাস বলেন- ‘কামলা পাই নাই, তাই নিজের ধান নিজেরাই কাইটা আনছি। ধান না থাকলে খামু কী?’
এই দৃশ্য শুধু সংগ্রামের নয়- এটি বেঁচে থাকার লড়াইয়ের নির্মম বাস্তবতা।
অব্যবস্থাপনা ও অভিযোগ
কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি বছর হাওরে বাঁধ নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও সেগুলো টেকসই হয় না। অনেক ক্ষেত্রে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও রাখা হয় না। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই পানি আটকে গিয়ে ফসল তলিয়ে যায়।
স্থানীয়দের ভাষায়, ‘বাঁধ আছে; কিন্তু কাজের না।’ এই অভিযোগ নতুন নয়- প্রতি বছরই ওঠে, আবার সময়ের সাথে চাপা পড়ে যায়।
প্রশাসনের উদ্যোগ ও সীমাবদ্ধতা
সরকারি পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফর সাত জেলায় প্রায় ১১ হাজার ধান শুকানোর যন্ত্র (ড্রায়ার) বরাদ্দ দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করছেন জনপ্রতিনিধিরা, দেয়া হচ্ছে আশ্বাস; কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে- এই উদ্যোগগুলো পরিস্থিতির তুলনায় অপ্রতুল। কারণ সমস্যা শুধু ধান শুকানো নয়, ধানই যদি না থাকে, শুকানোর যন্ত্র দিয়ে কী হবে?
মানবিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে হাওর
হাওরাঞ্চল প্রায় ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত, যেখানে দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে একমাত্র বোরো ফসল। সেই ফসলই যদি নষ্ট হয়ে যায়, তবে এর প্রভাব শুধু কৃষকের ঘরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না- ছড়িয়ে পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতেও। সুনামগঞ্জের এক কৃষক বলছিলেন- ‘বছরে একটাই ফসল। সেটিও যদি না পাই, তাহলে বাঁচমু কেমনে?’
এই প্রশ্নের উত্তর আজও কেউ দিতে পারেনি।
সামনে কী?
বর্তমান পরিস্থিতি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে হাওরাঞ্চলে- দীর্ঘস্থায়ী বন্যা দেখা দিতে পারে; খাদ্যসঙ্কট তীব্র হতে পারে; কৃষকের ঋণ পরিশোধ অসম্ভব হয়ে পড়বে; গবাদিপশুর মৃত্যু বাড়তে পারে। সবমিলিয়ে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। হাওরের মানুষ প্রতি বছরই প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বাঁচে; কিন্তু এবারের লড়াইটা যেন একটু বেশিই কঠিন। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা এখন তাদের কাছে শুধু পানি নয়- এটি ভেসে যাওয়া স্বপ্ন, হারিয়ে যাওয়া নিশ্চয়তা, আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতীক। হাওরের বুকজুড়ে এখন শুধু পানি নয়- ভাসছে হাজারো কৃষকের নীরব কান্না।



