নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় নেয়া একটি স্কুলের কাছে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে অন্তত ১২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরো অনেকে। খবর ডেইলি সাবাহর।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি উপেক্ষা করে চালানো সবশেষ হামলা এটি। হামলার আগে কিছু ফিলিস্তিনি অভিযোগ করেন যে ইসরাইল-সমর্থিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী ওই স্কুলে ঢুকে কিছু মানুষকে অপহরণের চেষ্টা করে। এ নিয়ে তাদের সাথে সংঘর্ষও হয় বলে স্থানীয় বাসিন্দা ও চিকিৎসকরা জানান। সংঘর্ষ চলাকালে, গাজার কেন্দ্রীয় অঞ্চলের মাঘাজি শরণার্থী শিবিরের পূর্ব দিকে ইসরাইলি ড্রোন থেকে দু’টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। এতে অন্তত ১০ জন নিহত এবং আরো কয়েকজন আহত হন।
এই হামলায় কতজন সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়। কারণ ঘটনাস্থলটি ছিল ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, যেখানে অধিকাংশই বাস্তুচ্যুত মানুষ বসবাস করছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী আহমদ আল-মাঘাজি জানান, ইসরাইল-সমর্থিত গোষ্ঠীর সদস্যরা তাদের এলাকায় হামলা চালায় এবং গুলি চালায়। বাসিন্দারা নিজেদের ঘরবাড়ি রক্ষার চেষ্টা করলে ইসরাইলি বাহিনী সরাসরি তাদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। পরে সোমবার এক ভিডিও বার্তায় ওই গোষ্ঠীর এক নেতা দাবি করেন, তারা হামাসের অন্তত পাঁচ সদস্যকে হত্যা করেছে। তবে ভিডিওটির সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
এ বিষয়ে হামাসের পক্ষ থেকে কোনো তাৎক্ষণিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। চিকিৎসা কর্মীরা জানিয়েছেন, সোমবার সকালে গাজা সিটিতে মোটরসাইকেলে করে যাওয়ার সময় ইসরাইলি ড্রোন হামলায় এক ফিলিস্তিনি নিহত ও সাথে থাকা এক শিশু আহত হয়।
চিকিৎসা কর্মীরা আরো জানান, ইসরাইলি সেনারা গাজার মধ্যাঞ্চলে একটি গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে আরেক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। এতে সোমবার সব মিলিয়ে ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ১২ জনে দাঁড়ায়।
হামাসকে অস্ত্র ছাড়তে ট্রাম্পের ‘পিস বোর্ডের আলটিমেটাম
হামাসকে অস্ত্রসমর্পণের প্রস্তাব গ্রহণের জন্য এই সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত সময় দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গঠন করা কথিত ‘গাজা বোর্ড অব পিস’। যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক এ সংস্থা যুদ্ধোত্তর গাজা অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা দেখভাল করছে, ইরানের যুদ্ধ চলাকালীনও এর পুনর্গঠন এগিয়ে নিয়ে যেতে দৃঢ-প্রতিজ্ঞ। এ বিষয়ে অবগত তিনজন সোমবার এ তথ্য জানিয়েছেন। খবর টাইমস অব ইসরাইলের। গাজা বোর্ড অব পিসের উচ্চ প্রতিনিধিত্বকারী নিকোলাই মøাদেনভ শুক্রবার কায়রোতে হামাসের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধিদলের সাথে বৈঠক করেছেন। দু’জন আরব কূটনীতিক এবং একটি তৃতীয় সূত্র জানিয়েছে, এই সশস্ত্র গোষ্ঠীকে জানানো হয়েছে যে গাজা তদারকি বোর্ড এই সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত একটি অস্ত্রসমর্পণ চুক্তি সম্পন্ন করতে চায়।
সূত্রগুলো পরিচয় গোপন করে স্পষ্ট করেছে যে, অস্ত্রসমর্পণ প্রস্তাবে ছোটখাটো সংশোধনী বিবেচনা করা হবে; কিন্তু হামাস যদি মৌলিক পরিবর্তনের অনুরোধ করে, তা গ্রহণযোগ্য হবে না। একজন আরব কূটনীতিক বলেছেন, মøাদেনভ বিশ্বাস করেন যে ট্রাম্পের গাজা যুদ্ধ শেষ করার পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ এগিয়ে নেয়া সম্ভব। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো-মিসর, কাতার ও তুরস্ক, এরকম আশাবাদী নন। মধ্যস্থতাকারীরা হামাসকে মার্কিন সমর্থিত অস্ত্রসমর্পণ প্রস্তাব গ্রহণের জন্য চাপ দিচ্ছেন; কিন্তু এই সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছাড়া সম্ভবত ‘হ্যাঁ’ বলবে না,’ কূটনীতিক উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেন, এমনকি তারা (হামাস) হ্যাঁ বললেও, ইসরাইল সম্ভবত তা মানবে না, কারণ নির্বাচনের বছরের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা থেকে সরে আসার বিষয়টি অনুমোদন করবেন না। তার জোট অংশীদাররা গাজায় স্থায়ী ইসরাইলি উপস্থিতি বজায় রাখার পক্ষে। কায়রোতে শুক্রবার বৈঠকে হামাসের কর্মকর্তারা সরাসরি অস্ত্রসমর্পণ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেননি, যা মøাদেনভ গত মাসে তাদের সামনে উপস্থাপন করেছিলেন।
ঠিকাদার নিহত : গাজা থেকে রোগী সরানো স্থগিত
গাজায় এক নিরাপত্তা ঘটনায় সংস্থার এক ঠিকাদার নিহত হওয়ার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইসও) সাময়িকভাবে চিকিৎসা-সংক্রান্ত রোগী সরানো (মেডিক্যাল ইভাকুয়েশন) কার্যক্রম স্থগিত করেছে। সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে জানান, সোমবার ওই ঠিকাদার নিহত হন এবং ঘটনাস্থলে থাকা আরো দুই কর্মী অক্ষত থাকেন। খবর মিডলিস্ট মনিটরের। তিনি বলেন, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে রাফাহ সীমান্ত দিয়ে গাজা থেকে মিসরে রোগী সরানো আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এই কার্যক্রম স্থগিত থাকবে বলে জানান তিনি। টেড্রোস নিহত ব্যক্তির পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, গাজায় কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীরা চরম ঝুঁকি নিয়েও মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। একই সাথে তিনি বেসামরিক মানুষ ও মানবিক কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলি হামলায় ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং এক লাখ ৭১ হাজারের বেশি আহত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চিকিৎসা সরিয়ে নেয়ার কার্যক্রম বন্ধ হওয়া হাজারো রোগীর জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
গাজা যুদ্ধে ইসরাইলকে সহায়তার অভিযোগ : গ্রিক শিপিং কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত দাবি
গাজা যুদ্ধের সময় ইসরাইলের কাছে জ্বালানি ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে সহায়তার অভিযোগ উঠেছে একাধিক গ্রিক শিপিং কোম্পানির বিরুদ্ধে। ‘নো পোর্ট ফর জেনোসাইড’ নামের একটি প্রো-প্যালেস্টাইন আন্দোলন এই অভিযোগ তুলে ধরেছে। খবর মিডলইস্ট মনিটরের। তাদের প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের মে থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তুরস্ক থেকে ইসরাইলি বন্দরে অন্তত ৫৭টি অপরিশোধিত তেলের চালান পাঠানো হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় চার কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল। যদিও তুরস্ক আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলের সাথে বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছিল।
প্রতিবেদনে আরো দাবি করা হয়, এসব জাহাজ তাদের জিপিএস ট্র্যাকিং বন্ধ করে এবং ভুয়া গন্তব্য দেখিয়ে প্রকৃত গন্তব্য গোপন করেছে। আন্দোলনের প্রতিনিধিরা গ্রিক কর্তৃপক্ষের কাছে এই অভিযোগের তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। এদিকে গ্রিক শিপওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি সামনে আসতে পারে বলে বিশ্লেষকদের মত।
বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা চায় ফিলিস্তিন
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জরুরি পদক্ষেপ ও নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। খবর আনাদোলু এজেন্সির। ফিলিস্তিন বলেছে, পশ্চিম তীরের সব হামলা ‘সংগঠিত ও রাষ্ট্রসমর্থিত’ এবং এর লক্ষ্য ফিলিস্তিনিদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা। তারা বসতি স্থাপনকারীদের আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পশ্চিম তীরে ৪,৭২৩টি হামলা চালিয়েছে এসব গোষ্ঠী, এতে ১৪ জন নিহত এবং ১,০৯০ জন বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
আল-আকসা মসজিদে ইসরাইলি মন্ত্রীর প্রবেশে আরব বিশ্বের নিন্দা
ইসরাইলের কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আরব দেশগুলো। খবর টিআরটি ওয়ার্ল্ডের। জেরুসালেমের ইসলামিক ওয়াকফ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বেন-গভির মরোক্কান গেট দিয়ে প্রবেশ করে মসজিদের আঙিনায় ঘুরে বেড়ান। কাতার এ ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও মুসলিমদের জন্য উসকানি হিসেবে বর্ণনা করেছে। জর্ডান এটিকে ‘অগ্রহণযোগ্য উসকানি’ বলে অভিহিত করেছে এবং মসজিদের মর্যাদা ক্ষুণœ করার অভিযোগ তুলেছে। ফিলিস্তিনের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এটিকে ‘প্রকাশ্য আগ্রাসন’ বলেছে। হামাসের মতে, এটি মসজিদটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার অংশ। উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারি থেকে চলমান জরুরি অবস্থার কারণে আল-আকসা মসজিদ দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরো উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে।



