নাজমুল মাছ ধরতে ধরতে চলে গেছে পূর্ব পাড়া। মাছের নেশা মানুষকে সব ভুলিয়ে দেয়। ওর চোখ কেবল মাছের দিকে। ঝোপঝাড়ের দিকে। যেখানটিতে মাছেরা বেশি করে থাকে। ঠেলাজাল দিয়ে ঝোপঝাড় আর শ্যাওলাযুক্ত জায়গায় ঠেলতে হয়। তবেই ভালো মাছ পাওয়া যায়।
নদীতে নতুন পানি এসেছে। অন্য বছর বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে পানি এলেও এ বছর চৈত্র মাসেই পানি এসে গেছে। নতুন পানির সাথে এসেছে মাছ, কচুরিপানা আর জোঁক। এগুলো পাহাড়ি ঢলের পানি। যতদিন ঢল আছে পানি আসবে। ঢল কমে গেলে পানিও কমে যাবে। এ পানি অস্থায়ী। এ যে বর্ষার পানি নয় গ্রামের ছেলে বুড়ো সবাই বুঝতে পারে। সবাই মাছ ধরার প্রতিযোগিতায় নামে।
নতুন পানির সাথে আকর্ষণীয় যে মাছটি এসেছে তা হলো বোয়াল। বড় বোয়াল নয়। সবই বোয়ালের পোনা। আকারে ছয়-সাত ইঞ্চির মতো। বড় বোয়াল এখন এ নদীতে পাওয়া যায় না। একসময় পাওয়া যেত। যা এখন অতীত। বড়দের চেয়ে ছোটদেরই আগ্রহ বেশি এ বোয়াল ধরার জন্য। দল বেঁধে ছেলেমেয়েরা মাছ ধরার জন্য নদীতে নামে। সবার হাতেই ঠেলা জাল। বড়রা নদীর বিভিন্ন জায়গায় বাইড় পাতে। সন্ধায় পাতলে সকালে গিয়ে দেখা যায় ভালোই আটকা পড়েছে। আবার পেতে রাখে। দুপুরে , বিকেলে বা বেশ কয়েক ঘণ্টা পরে পরে গিয়ে বাইড় তুলে মাছ বের করে আনে।
নাজমুল স্রোতের বিপরীতে জাল ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে যায়। পূর্বপাড়ায় যেখানটাতে নদীর সাথে খাল এসে মিশেছে সেখানে থামে। থামতে না থামতেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করে। বৃষ্টিতে ভিজতে তার ভালোই লাগছে। যদিও গা কেঁপে কেঁপে উঠছে। মাছ রাখার পাত্রটা বাঁশের বেতের তৈরি। পাত্রের দিকে চেয়ে দেখলো ভালোই মাছ ধরা হয়েছে। বোয়ালের পোনা আছে সাতটি। খুশিতে তার মন ভরে গেল। বোয়াল খেতে তার ভালোই লাগে। ভাবল, এবার বাড়ি যাওয়া যাক। তখনই হইচই শুনে সে খালের মুখের দিকে তাকাল। দেখল তার বয়সী ছেলেমেয়েরা সেখানে দলবেঁধে চিৎকার করছে। তাদের সবার হাতেই ঠেলাজাল। কাছে গিয়ে দেখল খালের মুখে জাল ধরে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। খালের পানি নেমে আসছে নদীতে। সাথে আসছে মাছ। সেই মাছ আটকা পড়ছে পেতে রাখা জালে। নাজমুলও একপাশে দাঁড়িয়ে ঠেলাজাল পেতে দিলো।
বাড়ি যাওয়া গোল্লায় যাক। আরো মাছ ধরতে হবে। মাছ ধরার নেশা বড় নেশা। ভুলে গেছে স্কুলে যাওয়ার কথা। ঝুম বৃষ্টি পড়ছে। জাল পেতে দাঁড়িয়ে একদল ছেলেমেয়ে। তাদের সবার চোখ মাছের দিকে। বৃষ্টির পানি পেয়ে মাছেরাও যেন খুশিতে আত্মহারা। তারা লাফিয়ে লাফিয়ে জালে এসে পড়ছে। বৃষ্টির পানিতে আনন্দে আত্মাহুতি দিতেও যেন তারা তৈরি। বৃষ্টির পানিতে মাছের বুক পিঠ ঝলমল করছে। ছেলেমেয়েরা ভুলে গেছে স্কুলের কথা। ভুলে গেছে কাদা বৃষ্টিতে ফুটবল খেলার কথা। বাড়ির উঠোনে কাদায় গড়াগড়ি খাওয়ার কথা।
যখন নাজমুল বাড়িতে গেলো তখন দুপুর। তখন বৃষ্টি কমে গেছে। মা কিছুক্ষণ বকাঝকা করল। নাজমুল পরিপাটি হয়ে নামাজ পড়তে যায়। নামাজ পড়ে এসে দেখে মা মাছ ভাজা করছেন। সে চুপচাপ গিয়ে পড়তে বসে। একসময় মা এসে খেতে ডাক দেন। নাজমুল মায়ের সাথে খেতে বসে। তার ধরা মাছ দিয়ে মা দুটো পদ করেছেন। একটি ঝোলের তরকারি আর মাছভাজা। নাজমুল খাবার মুখে দেবে তখনই এক ভিক্ষুক এসে দুয়ারে দাঁড়াল। এক থুত্থুরে বুড়ি। পরনে জীর্ণ কাপড়। দেখলেই কেমন যেন মায়া লাগে। নাজমুল মাকে ইশারা করতেই মা বুঝে ফেললেন ছেলের চোখের ইশারা। তিনি আরেকটি প্লেট নিয়ে খাবার বাড়তে লাগলেন। নাজমুল বুড়িকে তার পাশেই টেনে বসায়। মা বুড়ির পাতে দিলেন নাজমুলের ধরা সেই বোয়াল মাছের পোনা। ভাজা বোয়াল পোনা।
বোয়াল ভাজা হাতে নিয়ে বুড়ি অপলক সেদিকে চেয়ে রইলেন। তার চোখ ভিজে ওঠে পানিতে। বহুবছর পৃথিবী দেখা দুই চোখ যেন হয়ে ওঠে পদ্মপুকুর। সম্ভবত তিনি অনেক দিন বোয়াল ভাজা খান না। হয়তো তার মনের আয়নায় তখন ভেসে উঠেছে তার অতীতের স্মৃতি। তিনিও একদিন নাজমুলের মায়ের মতো এভাবেই মাছ ভাজা বেড়ে দিতেন স্বামী সন্তানের পাতে। বুড়ি বৃষ্টির মতোই অঝোরে কাঁদছেন। নাজমুল তার ছোট হাত দিয়ে মুছে দেয় বুড়ির চোখের পানি। বুড়ি নাজমুলকে জড়িয়ে ধরেন পরম মমতায়। নাজমুলের মায়ের চোখে পানি আর মুখে হাসি। ছেলের দয়া দেখে মায়ের বুক ভরে যায়।হ



