নয়া দিগন্ত ডেস্ক
মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জবাবদিহিতার দাবিতে দিল্লিতে সংসদ অভিমুখে ‘লং মার্চ’ কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থীরা। দেশটির ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এ কর্মসূচির ডাক দেয়। কর্মসূচি পালনকালে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইন্টারনেট বন্ধ করার পর এলাকাটি রণক্ষেত্রে পরিণত করে।
শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে আসছে। এ দাবিতে গতকাল সোমবার উত্তাল হয়ে ওঠে ভারতের সংসদ চত্বর। বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র পক্ষ থেকে সংসদ অভিমুখে একটি বিশাল প্রতিবাদ মিছিলের ডাক দেয়া হয়, ফলে নিরাপত্তার খাতিরে সংসদ ভবনের সমস্ত প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়া হয়।
ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে বলা হয়, দিল্লির যন্তর মন্তর এলাকাটি বর্তমানে একটি দুর্গে পরিণত হয়েছে। সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্সের তথ্য মতে, তারা প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের জমায়েত আশা করেছিলেন, কিন্তু বাস্তবে ১২,০০০-এরও বেশি মানুষ ওই মিছিলে যোগ দিলে পরিস্থিতি সামাল দিতে দিল্লি পুলিশ জরুরি ভিত্তিতে প্রতিটি জেলা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ এবং এসিপি পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের তলব করে। সংসদ চত্বরে ৩২টি কোম্পানি আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করার পাশাপাশি ড্রোন এবং নতুন সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে।
গত রোববার রাত থেকেই পুলিশ নেতাদের বাড়ি গিয়ে তাদের আটক করার চেষ্টা করে যাতে তারা মিছিলে যোগ দিতে না পারেন। সোমবার মিছিল চলাকালীন সংসদ অভিমুখে যাওয়ার পথে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে বেশ কয়েকজন প্রতিবাদী আহত হন। এ সময় ব্যারিকেড, টিয়ারগ্যাস এবং দাঙ্গাবিরোধী সরঞ্জামে সজ্জিত বাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে রাখে। সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের অনুরোধে তার অনশন ভঙ্গ করে প্রতিবাদ মিছিলে যোগ দেন। সোনম ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আঙমো যন্তর মন্তরের মঞ্চ থেকে এই ঘোষণা দেন। এই আন্দোলনে অভিনেতা প্রকাশ রাজ এবং শাবানা আজমি সংহতি প্রকাশ করে যোগ দেন। এ ছাড়া মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন আত্মঘাতী নিট পরীক্ষার্থী রিয়া কুমারীর বাবাও।
এ দিকে সিজেপি নেতা সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডার সাথে দেখা করেন। দিল্লি পুলিশ বর্তমানে ১২টি জোনে বিভক্ত হয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রতিটি জোনের দায়িত্বে রয়েছেন ডিসিপি পদমর্যাদার কর্মকর্তারা। পরিস্থিতি এখনো থমথমে এবং সংসদ চত্বরে উচ্চ সতর্কবার্তা জারি রয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবি হচ্ছে : শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের তাৎক্ষণিক পদত্যাগ, দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের হতাশায় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান। আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে পুলিশ আটক করেছে বলে জানানো হয়েছে।
সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনেই এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে; এমনকি মেট্রো স্টেশনগুলোর ভেতরেও, যা রাজধানী দিল্লির কেন্দ্রস্থলে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি করে। আন্দোলন চলাকালীন সাংবাদিকদের শাবানা আজমি জানান যে, তিনি এবং তার স্বামী, গীতিকার জাভেদ আখতার, এর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিতে তারা প্রধানমন্ত্রীকে আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলার অনুরোধ জানান। আজমি বলেন, আমরা একটি স্বীকৃতিপত্র পেয়েছিলাম, যেখানে বলা হয়েছিল দুই দিনের মধ্যে উত্তর দেয়া হবে, কিন্তু আমরা আর কোনো উত্তর পাইনি। সেই কারণেই আমি আজ এখানে এসেছি।
বলিউড থেকে কেন বেশি মানুষ এই আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন না এমন প্রশ্নের জবাবে আজমি পাল্টা প্রশ্ন করেন যে, কেন কেবল চলচ্চিত্র জগৎকেই লক্ষ্য করা হচ্ছে? তিনি প্রশ্ন তোলেন, আপনারা কেন কেবল বলিউড নিয়ে প্রশ্ন করছেন? শিল্পপতি বা ব্যবসায়িক নেতারা কোথায়, তা নিয়ে কেন প্রশ্ন করছেন না? এই প্রতিবাদ মিছিলে শাবানা আজমির পাশাপাশি যোগ দিয়েছিলেন অভিনেতা প্রকাশ রাজ, স্বরা ভাস্কর এবং কৌতুক অভিনেতা কুনাল কামরা। এ ছাড়াও জিনাত আমান, সোনাক্ষী সিনহা, দিয়া মির্জা, ওমি বৈদ্য এবং পাঞ্জাবি গায়ক কাকাসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব সোনম ওয়াংচুক এবং যন্তর মন্তরের প্রতিবাদীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন।
এ দিকে প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং দিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিষয় নিয়ে আলোচনার দাবিতে বিরোধী দলগুলোর তীব্র প্রতিবাদের মুখে লোকসভা ও রাজ্যসভা উভয় কক্ষই দিনের মতো মুলতবি করে দেয়া হয়। অধিবেশন শুরু হওয়ার পর থেকেই বিরোধীরা প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এবং দিল্লির যন্তর মন্তরে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র নেতৃত্বে চলমান ছাত্র বিক্ষোভ নিয়ে আলোচনার দাবি জানাতে থাকে। বিরোধীদের এই অনড় অবস্থানের কারণে বারবার সংসদীয় কার্যক্রমে বিঘœ ঘটে এবং দফায় দফায় অধিবেশন স্থগিত করতে হয়। রাজ্যসভায় বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে অভিযোগ করেন যে, সরকার দিল্লিতে চলমান প্রতিবাদ দমানোর চেষ্টা করছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে এবং সংসদের অচলাবস্থা নিরসনে রাজ্যসভার চেয়ারম্যান ভিপি রাধাকৃষ্ণান ‘বিজনেস অ্যাডভাইজরি কমিটি’র একটি বৈঠক আহ্বান করেন। তীব্র হট্টগোল ও বাগি¦তণ্ডার কারণে কোনো কার্যকর আলোচনা ছাড়াই সংসদের উভয় কক্ষের কার্যক্রম প্রথম দিনের মতো স্থগিত হয়ে যায়।



