মুহা: আব্দুল আউয়াল রাজশাহী ব্যুরো
নতুন অর্থবছরের বাজেট নিয়ে দেশজুড়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। সরকারের দাবি, এই বাজেট মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলের উন্নয়ন প্রত্যাশার সাথে বাজেটের বাস্তব প্রতিফলন কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
কৃষি, রেশম, আম, মৎস্য ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাভিত্তিক অর্থনীতির জন্য পরিচিত রাজশাহী অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগের দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু এবারের বাজেটে সেই প্রত্যাশার কতটুকু প্রতিফলন ঘটেছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির জন্য বিশেষ ঘোষণা নেই : রাজশাহী অঞ্চলের অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষি। দেশের অন্যতম বৃহৎ আম উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সুপরিচিত। পাশাপাশি ধান, গম, পেঁয়াজ, শাকসবজি, লিচু এবং মৎস্য উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এ অঞ্চল।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব দেয়া হলেও কৃষিপ্রধান রাজশাহীর জন্য বিশেষ কৃষি শিল্পাঞ্চল, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র কিংবা রফতানিমুখী কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো ঘোষণা বাজেটে নেই। ফলে কৃষিপণ্য উৎপাদন বাড়লেও তার বাণিজ্যিক মূল্য সংযোজনের সুযোগ এখনো সীমিত থেকে যাচ্ছে।
রেশম শিল্পে আশার চেয়ে হতাশাই বেশি : ‘রাজশাহী সিল্ক’ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর এ শিল্প ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তুঁত চাষ সংকোচন, কাঁচামালের স্ঙ্কট, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং বাজার সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধতার কারণে শিল্পটি এখনো সংগ্রাম করছে।
স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মতে, রেশম শিল্প পুনরুজ্জীবনে বিশেষ প্রণোদনা, গবেষণা সহায়তা, আধুনিক সুতা উৎপাদন প্রযুক্তি ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়নে আলাদা কর্মসূচি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাজেটে এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো বিশেষ উদ্যোগ দেখা যায়নি।
আম শিল্পে অবকাঠামোগত ঘাটতি : প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার আম উৎপাদিত হলেও রাজশাহী অঞ্চলে এখনো পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং রফতানি অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, এসব খাতে বিশেষ বরাদ্দ বা প্রকল্প ঘোষণা করা হলে আম শিল্প আরো বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হতে পারত।
কর্মসংস্থান সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ : রাজশাহী অঞ্চলে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করলেও স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে অনেক তরুণকে চাকরির সন্ধানে রাজধানী বা বিদেশমুখী হতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শিল্পায়ন ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অথচ বাজেটে উত্তরাঞ্চলভিত্তিক শিল্পপার্ক, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল কিংবা বৃহৎ বিনিয়োগ আকর্ষণের মতো উদ্যোগের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই।
স্বাস্থ্য খাতে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি : উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে শয্যা সঙ্কট, জনবল ঘাটতি এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা সেখানে বিদ্যমান। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও রাজশাহী অঞ্চলে বিশেষায়িত হাসপাতাল, ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, হৃদরোগ কেন্দ্র বা আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণের বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ না থাকায় অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেছেন।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ : বর্তমানে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। খাদ্যপণ্য, ভোজ্যতেল, ওষুধ, পরিবহনসহ প্রায় সব খাতে ব্যয় বেড়েছে। বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ চেইন শক্তিশালীকরণ এবং মজুদদারি নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যায়নি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক উন্নয়ন প্রকল্প দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কাক্সিক্ষত সুফল দিতে পারেনি। রাজশাহীর বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পও একই সমস্যায় পড়েছে। ফলে কেবল বরাদ্দ নয়, সঠিক বাস্তবায়নই হবে এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
কী বলছেন ব্যবসায়ী নেতারা : রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হাসেন আলী নয়া দিগন্তকে বলেন, “এবারের জাতীয় বাজেটে রাজশাহীকে কেন্দ্র করে কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর বিষয়ে প্রত্যাশিত ও আশাব্যঞ্জক কোনো সুস্পষ্ট উদ্যোগ প্রতিফলিত হয়নি। তবে আমরা বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করছি।” রাজশাহীতে ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে সেমিনার ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে। সেখানে বাজেটের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক বিশ্লেষণ করে রাজশাহী অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়ন করা হবে। পাশাপাশি সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে কার্যকর প্রস্তাব তুলে ধরা হবে।
রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মাসুদুর রহমান রিংকু নয়া দিগন্তকে বলেন, বাজেটের সাফল্য মূলত এর বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে। ঘোষিত পরিকল্পনা ও বরাদ্দ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে, আর বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, রাজশাহী অঞ্চল মূলত কৃষিভিত্তিক ও কৃষিপণ্যনির্ভর শিল্পের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। বাজেটে অঞ্চলভিত্তিক কোনো বিশেষ কর্মসূচি বা প্রকল্পের ঘোষণা না থাকলেও অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং কৃষি ও শিল্প খাতের উন্নয়নের যে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে, তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলও এর সুফল পেতে পারে।
প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মাঝখানে রাজশাহী : সব মিলিয়ে এবারের জাতীয় বাজেটে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে সচল রাখার প্রচেষ্টা থাকলেও রাজশাহী অঞ্চলের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধানে তেমন শক্তিশালী বার্তা পাওয়া যায়নি। কৃষি, রেশম, আম শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে উত্তরাঞ্চলভিত্তিক বিশেষ উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আঞ্চলিক বৈষম্য কমিয়ে টেকসই জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে রাজশাহীর মতো সম্ভাবনাময় অঞ্চলের জন্য পৃথক উন্নয়ন কৌশল, কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। অন্যথায় জাতীয় প্রবৃদ্ধির সুফল দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে পৌঁছানো কঠিন হবে।



