দিল্লি থেকে ফেরার সময় গুলিসহ আটক হন আশিয়ান গ্রুপের নজরুল

শাহজালাল বিমানবন্দর ঘিরে সক্রিয় দুষ্টচক্র, ৩০ সংস্থার মধ্যে নেই সমন্বয়

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

১৬ জুলাই দিল্লি এয়ারপোর্ট দিয়ে ফেরার সময়-ই ৩১ পিস গুলিভর্তি ব্যাগসহ আটক হয়েছিলেন আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো: নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া। এ সময় তিনি দিল্লি এয়ারপোর্ট অথরিটি সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদে শুধু বলেছিলেন, ‘আমি ঢাকা থেকে এসেছি’। এরপরই তাকে আটক ও গুলিভর্তি ব্যাগ বাজেয়াপ্ত করার কথা জানানো হয়। তারপর তার বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বা তাকে ছেড়ে দেয়া হলো কি না তা আর আমরা জানতে পারিনি।

গতকাল শনিবার দুপুরে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগিব সামাদ নয়া দিগন্তকে এ কথা বলেন। তিনি জানান, এ ঘটনায় দু’টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং স্ক্যানিংয়ের ব্যর্থতায় সংশ্লিষ্ট দু’জনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

এ দিকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঘিরে সক্রিয় রয়েছে দেশী-বিদেশী দুষ্টচক্র। এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরো বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে ৩০টি সংস্থা। এরপরও প্রতিদিন নানাভাবে দুষ্ট চক্রের সদস্যরা তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সম্প্রতি বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সার্বিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে সেখানে মন্ত্রী স্পষ্ট ঘোষণা দেন যে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভিআইপি সিআইপিসহ কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। এ ক্ষেত্রে সবাই সমান হবেন। নিরাপত্তা তল্লাশী প্রত্যেককেই ফেস করে যাওয়া-আসা করতে হবে।

সিভিল অ্যাভিয়েশন সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা নাম না প্রকাশের শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমানে প্রতি বছর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করছেন প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ যাত্রী। অথচ এই বিমানবন্দরের যাত্রী ক্যাপাসিটি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৮০ লাখ পর্যন্ত। এই বাড়তি যাত্রী ফেস করার ক্যাপাসিটি তাদের নেই। তারপরও তাদের বর্তমান জনবল ও ইকুইপমেন্ট দিয়েই পরিচালিত করতে হচ্ছে। অতিরিক্ত যাত্রীর পাশাপাশি ৯৭ লাখ ব্যাগ স্ক্রিনিং করতে হচ্ছে। এতে ভুলভ্রান্তি হচ্ছে। তবে কেউ ইচ্ছা করে বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে করছে কি না সেটা বিবেচ্য বিষয়।

শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক নয়া দিগন্তকে বলেন, আশিয়ান গ্রুপের মালিক নজরুল ইসলাম কিন্তু ভিআইপি না, রেগুলার প্যাসেঞ্জার হিসেবে ঢাকা থেকে যাচ্ছিলেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্যাসেঞ্জারদের দু’টি নিরাপত্তা ধাপ পার হতে হয়। হেভি লাগেজ এবং কেবিন লাগেজ। পলিটিক্যালি কোন সমস্যা কি দেখতে পেয়েছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এগুলো আসলে যাচাই করা সম্ভব হয় না। তবে আগে যারা একটি দলের লোক ছিল তারা এখন এই সরকারের লোক হিসেবে পরিচয় দেয়।

নিরাপত্তা তল্লাশীর ক্ষেত্রে পুরো বিমানবন্দর এলাকায় কতগুলো ইডিএস/ স্ক্যানিং মেশিন রয়েছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন এই মুহূর্তে সঠিক তথ্য দিতে পারছি না। তা ছাড়া এসব তথ্য পাবলিকলি বলাটাও ঠিক নয়। কারণ বিমানবন্দর ঘিরে অনেক ধরনের দুষ্টচক্র রয়েছে। তিনি বলেন, ২০২৫ সালে এক কোটি ২৭ লাখ যাত্রী বিমানবন্দর ব্যবহার করেছে। সেই ক্ষেত্রে জনবল বাড়েনি, ইকুইপমেন্টও বাড়েনি।

২ বছরে মোট কতগুলো অস্ত্র ও গুলির ঘটনা নিরাপত্তার তল্লাশী এড়িয়ে গেছে- এমন তথ্য কি আপনার জানা আছে? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, একজন মানুষ কত কথা বলতে পারে। আর সাংবাদিকের সংখ্যাও তো কম না। কতজনের সাথে কথা বলব, বলেন। সব তথ্য কি সাথে সাথে দেয়া সম্ভব?

বলা হলো, আপনি হলেন পুরো বিমানবন্দর টার্মিনালের প্রধান ব্যক্তি। গুলি অস্ত্রসহ স্ক্যানিংয়ে ধরা না পড়ার পেছনে মেশিনের সক্ষমতার বিষয় থাকতে পারে। তখন তিনি বলেন, আমরা এটিও পরীক্ষা করে দেখেছি। স্ক্যানিং মেশিনের সক্ষমতা রয়েছে। বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজ লিক হওয়া নিয়েও রয়েছে বিশেষজ্ঞদের নানা প্রশ্ন। বিমানবন্দর হচ্ছে কেপিআই ( কি পয়েন্ট ইন্সটলেশন) এলাকা। এখানে নীতিমালা অনুযায়ী কখনো ছবি তোলা যাবে না। কিন্তু ছবি নয় গোপনে ভিডিও করা হয়। ভিডিও কে কারা তুলে দিচ্ছে। এসব সিসিটিভি ফুটেজ ও ভিডিও আবার বাইরে চলে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, সিসিটিভি সিভিল অ্যাভিয়েশন, বিমান, এপিবিএনের আছে। আর আছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর। তারা আলাদা করে মেইনটেন করে। সূত্রের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সিসি ক্যামেরা ৩ জায়গা থেকে মনিটরিং করা হয়। এখন গোপন ভিডিও কিভাবে কার হাত ধরে বাইরে যাচ্ছে। কেন যায়। তবে এটি নিশ্চিত সিভিল অ্যাভিয়েশন থেকে আজ পর্যন্ত কোনো সিসিটিভির ফুটেজ বাইরে যায়নি। এ প্রসংগে নির্বাহী পরিচালক বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে দু-একটি সিসিটিভির ফুটেজ সরবরাহ করা হয়েছিল যাত্রী হয়রানির বিষয়গুলোর সত্যতা নিশ্চিত করতে।

গতকাল বিকেলে সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটির মুখপাত্র কাউছার মাহমুদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, বিমানবন্দরের একাধিক নিরাপত্তা তল্লাশি পার হয়ে গুলির ব্যাগসহ যাত্রী উড়োজাহাজে উঠে যাওয়ার ঘটনায় শুনেছি পৃথক দু’টি তদন্ত কমিটি হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে আনসার, বিমান ও সিভিল অ্যাভিয়েশনের চারজনকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিমানের দু’জন প্রটোকল দিতে এসেছিলেন। কারা সেটি বিমানের জনসংযোগ বিভাগ বলতে পারবেন। এক প্রশ্নের জবাবে কাউছার মাহমুদ বলেন, ইডিএস, হ্যান্ডহেলথ, মেটাল ডিকটেটর, স্ক্যানিং মেশিনে যারা প্রতিদিন দায়িত্ব পালন করেন তাদের বসার আগে নিয়মিত পরীক্ষা হয়। তারপর তাদের পরিচালনা করতে দেয়া হয়। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিছুদিন আগে মাননীয় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে মিটিং হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, ভিআইপি, সিআইপি সব চেক হবে। তিনি বলেন, প্রতি বছর আইকাউ, ইউকে কর্তৃক মূল্যায়ন হয়। সেখানে যে বেঞ্চমার্ক দেয়া হয় তার অনেক বেশি মার্ক পাই আমরা।

গতকাল শাহজালাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি নয়া দিগন্তকে বলেন, বিমানবন্দরে মাল্টি সংস্থা কাজ করে। এসব সংস্থার কাউকে কাউকে ম্যানেজ করে অনেক আজেবাজে লোক অনায়াসে ঢুকছে। এসব দুষ্ট লোকের কারণে কেপিআই এলাকা মাঝে মধ্যে অশান্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা। নির্ধারিত পাস ইস্যুর বাইরে যাতে কোনোভাবে বহিরাগত লোকজন প্রবেশ করতে না পারে একই সাথে সিকিউরিটি তল্লাশিতে যারা জড়িত তারাসহ প্রতিটি সংস্থার উপর মনিটরিং জোরদার করা সম্ভব হলে বিমানবন্দরে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়ানো সহজ হবে বলে মনে করছেন অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা।

এ দিকে আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের গুলির ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের মাধ্যমে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদন সিভিল অ্যাভিয়েশন সদর দফতরে পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নির্বাহী পরিচালক রাগিব সামাদ।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৬ জুলাই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের (বিজি-৩৯৭) ঢাকা থেকে দিল্লি যাওয়ার জন্য আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া, তার ছেলে আরিদিন ভূঁইয়া এবং মেয়ে নুসরাত জুবাইয়ারা বেলা ১২টা ৪০ মিনিটে বিমানবন্দরে প্রবেশ করেন। তারা চেক ইন করতে ডি লাইনে দাঁড়ান। আনুষ্ঠানিকতা শেষে তারা চূড়ান্ত নিরাপত্তা তল্লাশির জন্য বোর্ডিং ব্রিজ-১ এ যান। ফাইনাল তল্লাশি শেষে বেলা পৌনে ২টায় তাদের বহনকারী ফ্লাইট ঢাকা ছেড়ে যায়। দিল্লি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পরবর্তীতে ঘটনাটি জানার পর ঢাকার কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করে।

ওই প্রতিবেদনের এক জায়গায় বলা হয়, ওই দিন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কর্মী মিজানুর রহমান ও সাইফুল ইসলাম হেভি লাগেজ গেট দিয়ে তাদের প্রটোকল দিয়েছেন। এ সময় স্ক্রিনিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন সিপাহি মহিনুর।