বলিউড সিনেমায় ব্যবসায়িক পতন

Printed Edition
বলিউড সিনেমায় ব্যবসায়িক পতন
বলিউড সিনেমায় ব্যবসায়িক পতন

সাকিবুল হাসান

ঈদ হল উৎসবের অন্যতম একটি সময়, যেখানে সিনেমার মুক্তি সাধারণত বড় ব্যবসা অর্জন করে। গান-বাজনা, নাচ, সংগীত, সিনেমা—সবকিছুই উৎসবের আবহে দর্শকদের আনন্দের অংশ। তবে গত কয়েক বছর ধরে বলিউডে ঈদের সিনেমার ব্যবসায় একটি বিরাট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেখানে একসময় ঈদের দিন মানেই ছিল বলিউডের ব্লকবাস্টার সিনেমা মুক্তি, সেখানে এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে গেছে।

এ বছর ঈদের সময় মুক্তি পেয়েছিল সালমান খান অভিনীত সিনেমা ‘সিকান্দার’। দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় নির্মাতা এআর মুরুগাদোস পরিচালিত এই সিনেমা নিয়ে দর্শকদের মধ্যে একসময় ছিল প্রচুর উত্তেজনা। তবে সিনেমার মুক্তির পর তা ব্যবসায়িক দিক থেকে হতাশাজনক ফলাফল দেখিয়েছে। তিন দিন পরেই সিনেমার আয় ছিল ৮২ কোটি রুপি, কিন্তু চতুর্থ দিনে তা ৫৫ শতাংশ কমে মাত্র ৯ কোটি রুপি পর্যন্ত নেমে যায়। এই ধরনের পতন অনেকেই অপ্রত্যাশিত মনে করছেন, কারণ কাছাকাছি সময়ে কোন বড় সিনেমা মুক্তি পায়নি।

এর আগে ২০২৩ সালে সালমানের আরেক সিনেমা ‘কিসি কা ভাই... কিসি কি জান’ও ফ্লপ হয়েছিল, যা আরও একবার প্রমাণ করে যে, এখন আর ঈদে সালমান খান এককভাবে সিনেমার ব্যবসায় সফলতা নিশ্চিত করতে পারছেন না। একসময় ঈদের সিনেমা মানেই ছিল সালমান খান, কিন্তু তার সাম্প্রতিক সিনেমাগুলি সেই ধারা বজায় রাখতে পারছে না।

বলিউডে ঈদের সিনেমা মুক্তির ঐতিহ্য গড়ে তুলেছিলেন শাহরুখ খান। ২০০১ সালে ঈদ উপলক্ষে মুক্তি পায় তার সিনেমা ‘কাভি খুশি কাভি গাম’, যা ছিল একটি পারিবারিক আবহে তৈরি ব্লকবাস্টার। এরপর আরও একাধিক ঈদের সিনেমা—‘কাল হো না হো’ (২০০৩), ‘বীর-জারা’ (২০০৪), ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ (২০১৩)—সবই বক্স অফিসে বিপুল সাফল্য পায়। শাহরুখের সিনেমাগুলি ঈদের সিনেমার বাজারের রূপকার হয়ে ওঠে।

২০১০ সাল থেকে সালমান খানও ঈদের সিনেমার ক্ষেত্রে রাজত্ব শুরু করেন। তার সিনেমাগুলি—‘দাবাং’ (২০১০), ‘এক থা টাইগার’ (২০১২), ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ (২০১৫)—সবই ছিল ঈদের সময় মুক্তি পাওয়া ব্লকবাস্টার। এসব সিনেমা ২০০ কোটি রুপি থেকে শুরু করে ৪০০ কোটি রুপি পর্যন্ত আয় করেছিল। তবে, ২০২০ সালের পর থেকে বলিউডের সিনেমার বাজারে এক নতুন পরিবর্তন এসেছে, যা ঈদের সিনেমার ব্যবসাকেও প্রভাবিত করেছে।

২০২০ সালে কভিড-১৯ অতিমারী সিনেমা এবং দর্শকের সম্পর্ক পরিবর্তন করে। যেখানে একসময় দর্শকরা সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখতেন, সেখানে এখন বাড়িতে বসেই তারা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সিনেমা দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। পাশাপাশি দক্ষিণী সিনেমার জনপ্রিয়তা উত্তর ভারতে বাড়ছে। এর ফলস্বরূপ, বলিউডের সিনেমাগুলি ক্রমশই বাজার এবং জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। বিশেষ করে ঈদের সিনেমার ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়েছে।

এই পরিবর্তনের মাঝেই বাংলাদেশের সিনেমা এক নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশী সিনেমা ভিজ্যুয়ালি এবং গল্প বলায় অনেক উন্নতি করেছে। ঈদে মুক্তি পাওয়া অ্যাকশন, ফ্যামিলি ড্রামা, রোমান্টিক সিনেমাগুলি দর্শকদের মাঝে ভালো সাড়া ফেলছে। তবে, বলিউডের সিনেমার তুলনায় বাংলাদেশের সিনেমাগুলির বাজার এখন অনেক বেশি এগিয়ে যাচ্ছে।

বলিউডের ঈদের সিনেমার ঐতিহ্য যদি এই ভাবে পতন ঘটে, তবে এর ভবিষ্যত নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। যে সময় একে ‘সালমান খানের ঈদ’ বলে পরিচিত ছিল, সেই সময়টি শেষ হয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে। এখন বলিউডকে আবার নতুন কোন দিক থেকে সিনেমা তৈরি করতে হবে, যেখানে নতুন তারকাদের উত্থান, গল্পের বৈচিত্র্য এবং আধুনিক দর্শকদের আকর্ষণ থাকবে।

বয়সের সাথে সাথে বলিউডে ঈদের সিনেমার বাজারে যে পরিবর্তন এসেছে, তা মেনে নিতে হবে। এখন সময় এসেছে নতুন ধারা এবং নতুন প্রচেষ্টার। বলিউড যদি আবার সফল হতে চায়, তবে তাকে দর্শকদের পরিবর্তিত রুচি এবং বর্তমান ট্রেন্ডের সাথে তাল মেলাতে হবে। অন্যথায়, ঈদের সিনেমার সাফল্য একসময় ইতিহাসে পরিণত হতে পারে।