শোয়েব উদ্দিন জৈন্তাপুর (সিলেট)
সিলেটের বুক চিরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ পাহাড় ও টিলাগুলো আজ ক্ষতবিক্ষত। অনেক জায়গায়ই পাহাড় টিলার সেই দৃশ্য এখন আর নেই। নির্বিচারে টিলা কেটে সাবাড় করে ফেলছে বেপরোয়া মাটিদস্যু চক্র। এই চক্রের স্কেভেটরের থাবায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে একের পর এক সবুজ পাহাড়। ছোট-বড় পাহাড়ি টিলা এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ধরে রেখেছে। তবে উপজেলার ৫নং ফতেপুর ইউনিয়নের উৎলারপার ও শ্যামপুর (দলইপাড়া) নামক এলাকায় অবাধে কাটা হচ্ছে পাহাড়িটিলা। দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে টিলা কর্তন ও মাটি পাচার চললেও প্রশাসনের নীরবতা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সরেজমিন পরিদর্শন ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, জৈন্তাপুর উপজেলার সবচেয়ে বিপজ্জনক এলাকা উৎলারপার (আগুন পাহাড়) এলাকার হরিপুর মৌজার দাগ নং ১৭১, ১৭৬, ১৭৭ এর আব্দুর রফিক, আবুল হাসনাত, শাহের মোল্লা, আব্দুল মুতলিব, নাজমুল আলম, কবির আহমদ মোল্লা ও শ্যামপুর (দলইপাড়া) গ্রামে প্রবাসী পরিবারের বাড়ির টিলা জোরপূর্বক কেটে নিচ্ছে গ্রামের মৃত আব্দুস সালামের ছেলে ফারুক আহমদ, কামাল আহমদ, নাজিম আহমদের নেতৃত্বে টিলা কাটা চলছে। প্রবাসী পরিবারের বাড়ির দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশের টিলা কেটে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। এতে পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি বসতভিটার নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়েছে।
তথ্যানুসন্ধ্যানে আরো জানা যায়, এসব এলাকায় প্রতিদিন গভীর রাতে চলে পাহাড় ও টিলা কেটে মাটি পাচারের মহোৎসব। রাত যত গভীর হয় ততই তৎপরতা বেড়ে যায় মাটিখেকোদের। প্রতিদিন শত শত ট্রাকে করে এই মাটি চলে যাচ্ছে আবাসন প্রকল্প ও বাণিজ্যিক নিচু জমি ভরাটের কাজে। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, হুমকিতে পড়ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। এতে করে এক দিকে যেমন এসব এলাকার পাহাড় ও টিলাভূমি বিলীন হচ্ছে তেমনি পরিবেশ ও প্রতিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। প্রশাসনের কর্মকর্তা ব্যক্তিদের সাথে এসব মাটিখেকো সিন্ডিকেটের গোপন সমঝোতা থাকায় অনেক সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বেকায়দায় পড়তে হয় সংবাদকর্মীদেরও।
স্থানীয়রা জানান, এ ঘটনায় অসাধু ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জৈন্তাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হলেও প্রয়োজনীয় কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
লোকমান আহমদ বলেন, হরিপুর উৎলারপার প্রাকৃতিক খনিজসম্পদসমৃদ্ধ এলাকায় অবাধে চলে লালমাটির টিলা কাটা। বাড়িঘর নির্মাণের কথা বলে ৬০-৭০ ফুট উঁচু টিলা কেটে মাটির শ্রেণী পরিবর্তন করে সমতল করা হয়। এরপর পাহাড় ও টিলার মাটি বিক্রি করা হয়। এরই মধ্যে ওই এলাকার কয়েকটি পাহাড় কেটে সমতলে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। পরিবেশবাদীদের প্রতিবাদের মুখে লোক দেখানো দু-একটি অভিযান পরিচালনা করা হলেও বাস্তবে তার প্রভাব পড়েনি। জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশ এ ব্যাপারে নীরব।
সেলিম আহমদ বলেন ‘আমরা দুই ভাই প্রবাসে থাকি। বাড়িতে শুধু আমাদের অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা রয়েছেন। এই সুযোগে মাটিদস্যু চক্র জোরপূর্বক আমাদের বাড়ির দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশের টিলা কেটে বসতভিটাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। তারা আমাদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনও করছে। আমরা প্রবাসী হিসেবে জৈন্তাপুর উপজেলা প্রশাসন ও জৈন্তাপুর মডেল থানা পুলিশের সহযোগিতা কামনা করছি। বিষয়টি নিয়ে আমরা আইনগত প্রক্রিয়ায় রয়েছি।’
এ বিষয়ে জৈন্তাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো: মনিরুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে অভিযানের সময় সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থলে টিলা কাটার সত্যতা পাওয়া গেছে এবং টিলা কর্তনের আলামত ও অভিযুক্তদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদফতরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠির জবাব আসার পর পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
পরিবেশ অধিদফতর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানিমা আক্তার বলেন, আপনারা লিখিত অভিযোগ করুন তারপর আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নিবো।



