আগস্টের ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্র পরিচালায় এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে প্রশাসনও। অন্তর্বর্তী সরকার নানাভাবে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করলেও সেটি সম্ভব হয়নি। সকালে সিদ্ধান্ত নিলে সন্ধ্যায় আবার সেটি বদলে যেত। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা ছিল রাজনৈতিক সরকার আসলে প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরবে। কিন্তু সরকার গঠনের দেড় মাস পার হলেও প্রশাসনে পদায়ন-পদোন্নতিতে শৃঙ্খলা ফিরেনি। এতে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানা গেছে।
আওয়ামীপন্থী ৩ সচিবকে সংযুক্ত করে পুনর্বহাল : গত ২৫ মার্চ আওয়ামী সুবিধাভোগী অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক; বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব সমন্বয় ও সংস্কার জাহেদা পারভীন এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফারহিনা আহমেদকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে সরকার। সংযুক্ত করার সাথে সাথেই অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক এর সংযুক্তের আদেশ স্থগিত করা হয়। এর পরের দিন বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরীর প্রজ্ঞাপনও স্থগিত করা হয়। সংযুক্ত করার সাথে সাথেই আবার সেটি বাতিলের ঘটনা নজিরবিহীন বলে জানিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের ঘটনা সরকারের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে দুর্বলতা প্রমাণ করে। সরকার যদি সিদ্ধান্ত নিয়েই থাকে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে তা হলে সেটি আবার প্রত্যাহার করবে কেন?
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর গতিশীল জনপ্রশাসন আমরা আশা করেছিলাম। কিন্তু আদেশ জারি করার পর সাথে সাথেই প্রত্যাহারের এমন ঘটনা রাজনৈতিক সরকারের কাছে প্রত্যাশিত নয়। যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে চিন্তা-ভাবনা করা উচিত।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েও যোগ দিতে পারলেন না এবাদুর রহমান : গত ২৫ মার্চ সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ৪৯ ধারা অনুযায়ী এস এম এবাদুর রহমানকে অন্য যে কোনো পেশা, ব্যবসা কিংবা সরকারি, আধা-সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান/সংগঠনের সাথে কর্র্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে যোগদানের তারিখ থেকে এক বছর মেয়াদে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। এই প্রজ্ঞাপনের আগে আওয়ামী সুবিধাভোগী অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকীকে জনপ্রশাসনে সংযুক্ত করা হলেও সেই প্রজ্ঞাপনটি বাতিল করে সরকার। ফলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া এই কর্মকর্তা অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে যোগ দিতে পারেননি।
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর নিয়োগ বাতিল : নিয়োগের পাঁচ দিন পর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী আবদুর রশীদ মিয়ার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করেছে সরকার। রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর আগে গত ২৪ মার্চ তাকে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব থেকে অবসরে যান আবদুর রশীদ। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিলে বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা শুরু হয়। পরে তার সেই নিয়োগ বাতিল করা হয়।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে থাকার সময় তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে আবদুর রশীদের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রশাসনের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব পদটি শূন্য ছিল। জনপ্রশাসন সচিব নিজেই এই দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। কিন্তু তিনি দীর্ঘদিন ধরে সার্ভিসের বাইরে থাকায় চাকরিরত কর্মকর্তাদের চেনেন না। এ ছাড়া দিনের বেশির ভাগ সময় শারীরিক নানা জটিলতায় ভোগেন। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই পদায়নে এমন সমস্যা তৈরি হচ্ছিল। সম্প্রতি এপিডি উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে একজন মেধাবী কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ফলে আশা করি পদায়নে সৃষ্টি জটিলতা কেটে যাবে।


