প্রতিদিন পাঁচটি খাল সাঁতরে স্কুলে যেতে হয় শিশুদের

Printed Edition
গলাচিপায় সাঁতার কেটে খাল পার হয়ে স্কুল যাচ্ছে শিশুরা	: নয়া দিগন্ত
গলাচিপায় সাঁতার কেটে খাল পার হয়ে স্কুল যাচ্ছে শিশুরা : নয়া দিগন্ত

হারুন অর রশিদ গলাচিপা (পটুয়াখালী)

বাড়ি থেকে স্কুলে যেতে প্রতিদিন পাঁচটি খাল সাঁতরে পাড়ি দিতে হয় দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী জহিরুলকে। স্কুল শেষে বাড়ি ফিরতেও একইভাবে পাঁচটি খাল সাঁতরে পাড়ি দিতে হয়। গ্রীষ্ম, বর্ষা কিংবা শীত- বারো মাসই এমন দুর্ভোগ পোহাতে হয় তাকে। শুধু জহিরুল নয়, পটুয়াখালীর গলাচিপা সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিচ্ছিন্ন অংশ চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সোহাগ, আব্দুল্লাহ, লামিয়া, হাসিবসহ অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই প্রতিদিনের কর্মচিত্র এটি।

বিদ্যালয়ে যাতায়াতের জন্য এ এলাকায় নেই কোনো সড়ক, নৌযান কিংবা বিকল্প ব্যবস্থা। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একের পর এক খাল সাঁতরে অথবা বুকসমান পানিতে হেঁটে স্কুলে যেতে হয় তাদের। মাঝে মধ্যে কোনো অসতর্কতায় ভিজে যায় বই-খাতাসহ পোশাক পরিচ্ছদ। স্কুলে পৌঁছে অনেকে ভেজা জামা পরিবর্তন করে ক্লাস করে। অনেকে সেই ভেজা কাপড় পরেই ক্লাসে অংশ নেয়। এতে অনেকে আবার অসুস্থ হয়ে যায়। তখন কয়েকটা দিন তাকে স্কুলে অনুপস্থিত থাকতে হয়।

সরেজমিন দেখা যায়, গলাচিপা সদর ইউনিয়নের বিচ্ছিন্ন চরকারফারমার দক্ষিণে ম্যানগ্রোভ বন। এরপরই বঙ্গোপসাগর। পশ্চিমে রাবনাবাদ নদী, পূর্বে তেঁতুলিয়া নদী এবং উত্তরে আগুনমুখা নদী। চার দিকে নদীবেষ্টিত এ চরে নেই কোনো সড়ক যোগাযোগ। গলাচিপা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে বোয়ালিয়া স্লুইসগেট। সেখান থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার হেঁটে যেতে হয় আগুনমুখা নদীর তীরে খেয়াঘাটে। নদী পাড়ি দিয়ে কারফারমা দ্বীপে যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম নৌকা।

প্রকৃতির সৌন্দর্যে ঘেরা এ চরে নেই বেড়িবাঁধ, পাকা রাস্তা কিংবা নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা। বর্ষায় জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় রাস্তাঘাট ও বিদ্যালয়ের মাঠ। ফলে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, চরটিতে প্রায় ১০০ জেলে-কৃষক পরিবারের পাঁচ শতাধিক মানুষের বসবাস। শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে প্রাক-প্রাথমিকসহ ছয়টি শ্রেণীতে ৫১ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন তিনজন। তবে যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্কটে ধীরে ধীরে অনেক শিশু স্কুলে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থী হাসিবুল ইসলাম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর আছিয়া জানায়, বৃষ্টি ও খালের পানিতে শরীর প্রায়ই ভিজে যায়। ভেজা শরীর নিয়েই ক্লাস করতে হয়। অসুস্থ হলে কয়েক দিন আর স্কুলে যাওয়া হয় না। তাদের একটি নৌকা থাকলেও সেটি দিয়ে বাবা নদীতে মাছ ধরতে যান। তাই খাল সাঁতরেই তাদেরকে স্কুলে যেতে হয়।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো: নেছার উদ্দিন বলেন, ‘রাস্তাঘাট না থাকায় আমাদের অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। আমরা খেয়া বা স্থানীয় জেলেদের নৌকায় যাতায়াত করতে পারলেও শিক্ষার্থীদের খাল সাঁতরেই আসতে হয়। স্কুল ফিডিং কর্মসূচির খাবার পৌঁছাতেও সংশ্লিষ্টদের বেগ পেতে হয়। রাস্তাঘাট হলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়বে বলে আশা করি।’ এলাকায় বি.এ পাস যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি না থাকায় বিদ্যালয়ের সভাপতি নির্বাচন করা যায়নি বলেও জানান তিনি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি শাহিদা বেগম বলেন, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য তারা জায়গা দিয়েছেন। কিন্তু নিজেদের উদ্যোগে রাস্তা নির্মাণের সামর্থ্য নেই। স্কুলে যাতায়াতের জন্য হলেও কিছু রাস্তাঘাট নির্মাণ করা জরুরি।

সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো: জাহাঙ্গীর হোসেন টুটু বলেন, স্কুলে যাওয়ার রাস্তা নেই- এ কথা সত্য। আপাতত কোনো বরাদ্দও নেই। বরাদ্দ পাওয়া গেলে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হবে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো: গোলাম সগীর বলেন, রাস্তা না থাকায় স্কুলে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বিষয়টি দুঃখজনক। স্কুলে যাওয়ার রাস্তা না থাকার বিষয়টি ইউএনওকে জানিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো: ইজাজুল হক বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হবে। জায়গাটি পরিদর্শনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী এবং পটুয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো: নুরুল হক বলেন, শিশুদের পড়াশোনার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে বড় ধরনের বাজেট প্রয়োজন। তবে আপাতত তাদের যাতায়াতের জন্য দ্রুত একটি নৌকা বা ট্রলারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।