মীর মোকাম্মেল আহছান
যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে সদ্য শেষ হয়েছে ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের ২৩তম আসর। বিশ্বকাপের শুরু থেকেই বলের দখল, দ্রুত পাসিং ও উচ্চ গতির প্রেসিংয়ের মাধ্যমে একের পর এক প্রতিপক্ষকে হারিয়ে ফাইনালে স্পেন। শিরোপা লড়াইয়ে অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ট্রফি পুনরুদ্ধার করে লা রোজারা। গ্রুপ পর্বে আফ্রিকার দেশ কেপ ভার্দের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচটি বাদ দিলে পুরো আসরেই সবচেয়ে ধারাবাহিক ফুটবল খেলেছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।
ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ হওয়া আসর নিয়ে এখনো আলোচনার শেষ নেই। স্পেনের শিরোপা জয়, কিলিয়ান এমবাপ্পের গোলের পর গোল কিংবা লামিনে ইয়ামালের উত্থান, রেফারিং নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল মাঠের ফুটবলের ধরন। এই আসরকে কৌশলগত দিক থেকে অনেক বিশ্লেষকই আখ্যা দিচ্ছেন ‘পাওয়ার’ ও ‘চার্জিং ফুটবল’-এর বিশ্বকাপ হিসেবে। যেখানে বল দখলের সৌন্দর্যের চেয়ে শারীরিক শক্তি, গতি, প্রেসিং এবং এক মুহূর্তও প্রতিপক্ষকে স্বস্তি না দেয়ার মানসিকতাই ছিল লক্ষ্যণীয়।
টুর্নামেন্টজুড়েই বল হারানোর সাথে সাথে আক্রমণাত্মক প্রেসিংয়ে বল নিজেদের দখলে নিয়েছে প্রায় অধিকাংশ দলই। মাঝমাঠে প্রতিপক্ষকে সময় না দিয়ে একযোগে চার্জ করে বল পুনরুদ্ধারের চেষ্টাই ছিল শীর্ষ দলগুলোর সাধারণ কৌশল। খেলার গতি ছিল আগের যেকোনো বিশ্বকাপের তুলনায় অনেক বেশি। উচ্চগতির প্রেসিংকে অস্ত্র বানিয়েছে স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, পর্তুগাল, নরওয়ে কিংবা মরক্কোর মতো দলগুলো।
এবারের বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ম্যাচজুড়ে অবিরাম দৌড়, দ্রুত স্প্রিন্ট এবং উচ্চমাত্রার শারীরিক সংঘর্ষ ছিল প্রায় প্রতিটি ম্যাচের সাধারণ চিত্র। ফিফার পারফরম্যান্স বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, আগের আসরগুলোর তুলনায় উচ্চগতির দৌড় এবং স্প্রিন্টের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশেষ করে স্পেনের শিরোপা জয়ের পথটি দেখিয়েছে আধুনিক ফুটবলের নতুন রূপ। ছোট ছোট পাস আর দীর্ঘ সময় বল দখলে রাখাটায় এক সময়ের পরিচিতি ছিল স্পেনের ফুটবলের। কিন্তু এবার তারা বল দখলের পাশাপাশি অবিশ্বাস্য গতিতে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। আক্রমণ থেকে রক্ষণে এবং রক্ষণ থেকে আক্রমণে রূপান্তরের গতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এই ধারাবাহিক চার্জিং ফুটবলই শেষ পর্যন্ত সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে লা রোজাদের।
প্রেসিং ফুটবলের কারণে নকআউটে শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল বিশ্বকাপের রেকর্ড পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে। একই চিত্র ছিল শেষ ষোলোতে পর্তুগাল ও স্পেন এবং যুক্তরাষ্ট্র বেলজিয়াম ম্যাচেও। যে নরওয়ে শেষ ষোলোর ম্যাচে ব্রাজিলকে হারিয়েছিল প্রেসিং ফুটবলে, সেই দলটিই কোয়ার্টার ফাইনালে বিপরীত চিত্র দেখে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল টুর্নামেন্ট থেকে।
বিশ্বকাপে দারুণ ছন্দে ছিল ফ্রান্সও। কিলিয়ান এমবাপ্পের গোল করার ধারাবাহিকতা দলকে একের পর এক জয় এনে দেয়। শেষ পর্যন্ত শিরোপা জেতা সম্ভব নাা হলেও পুরো আসরে লেস ব্লুজরা ছিল সবচেয়ে আক্রমণাত্মক দলগুলোর একটি। অথচ পুরো টুর্নামেন্টে যে দলটি পাওয়ার ও প্রেসিং ফুটবলে ছুটে চলছিল শিরোপার দিকে, তারাই কিনা সেমিফাইনালে কোনো প্রতিরোধ গড়তে পারেনি চ্যাম্পিয়ন স্পেনের সামনে। ২-০ গোলে হেরে আসর থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের।
বিশ্বকাপের শেষ হওয়া আসরে অন্যতম সফল দল ছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাও। গ্রুপ পর্ব ও নকআউটে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ জিতে তারা টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে জায়গা করে নেয়। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে থেকেও প্রেসিং ফুটবলে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২-১ গোলের জয় তুলে নেয় লিওনেল স্কালোনির দল। ফাইনালে তিনবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের চিত্রও ছিল একই রকম। স্পেনের কাছে ১-০তে হেরে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন ভেঙে যায় লিওনেল মেসিদের। নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ম্যাচে জয় তুলে নিয়ে শক্তির জানান দেয়া ইংল্যান্ড, পর্তুগাল, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম ও ব্রাজিলের মতো দলগুলো নকআউট পর্বে ছোট ছোট ভুলের কারণে শিরোপার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। অন্য দিকে চমক দেখিয়ে বিশ্বকাপে নতুন শক্তির বার্তা দিয়েছে কেপ ভার্দে, মিশরের মতো আফ্রিকান দলগুলো।
শুধু জয়ের গল্পই নয়, নকআউট পর্ব নিশ্চিতের লক্ষ্যে অনেক দলের গ্রুপ পর্বের সমীকরণটাও ছিল খুবই কঠিন। এবারের বিশ্বকাপে বেশ কয়েকটি ম্যাচ ড্র হওয়ায় নকআউটে জায়গা পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে গ্রুপের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। সমশক্তির দলগুলোর লড়াইয়ে রক্ষণভাগের দৃঢ়তা ও গোলরক্ষকদের অসাধারণ পারফরম্যান্সের কারণে অনেক ম্যাচে কোনো দলই জয় নিশ্চিত করতে পারেনি। কিছু ম্যাচ গোলশূন্য ড্র হয়েছে, আবার কিছু ম্যাচে দুই দলই গোল করলেও শেষ পর্যন্ত পয়েন্ট ভাগাভাগি করে মাঠ ছাড়ে। এসব ড্র অনেক গ্রুপের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে। কেপ ভার্দে শুধু ড্রয়ের সুবাদে নকআউট পর্বে উঠেছে, আবার ইরান একাধিক ড্র’র কারণে বিদায় নিয়েছে। ফলে জয় যেমন মূল্যবান ছিল, তেমনি একটি ড্র’ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে নকআউটে জায়গা পেতে। যেমন ‘এইচ’ গ্রুপে বিশ্বকাপের নবাগত দল কেপ ভার্দে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেনের সাথে গোলশূন্য ড্র’র পর দুইবারের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়েকেও ২-২ গোলে রুখে দেয়। আর গ্রুপের শেষ ম্যাচে এশিয়ান অন্যতম শক্তিশালী দল সৌদি আরবের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র’র ফলে নকআউটে জায়গা করে নেয় পাঁচ লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যার আফ্রিকার দেশটি।
ফুটবলের সৌন্দর্য এখনো ড্রিবল, পাস কিংবা নিখুঁত ফিনিশিংয়ে লুকিয়ে থাকলেও ২০২৬ বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিয়েছে, ভবিষ্যতে ফুটবলে এসব গুণের পাশাপাশি অসাধারণ শারীরিক সক্ষমতা ও নিরন্তর প্রেসিংই হবে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। তাই ইতিহাসে এই আসর স্মরণীয় হয়ে থাকবে ‘পাওয়ার’ ও ‘প্রেসিং ফুটবল’র বিশ্বকাপ হিসেবে। সব মিলে সদ্য শেষ হওয়া বিশ্বকাপে একাধিক ড্র’তে প্রতিযোগিতাকে আরো অনিশ্চিত ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। প্রযুক্তি আর আক্রমণাত্মক ফুটবলের এই সমন্বয় ভবিষ্যতের বিশ্বকাপগুলোর জন্যও খুলে দিয়েছে নতুন দিগন্ত।



