বিশেষ সংবাদদাতা
‘আমাদেরকে যুদ্ধে পাঠানোর জন্য রাশিয়ার আর্মিরা তাদের পোশাক পরিয়ে জোর করে ট্রেনিং করাইতেছে। ট্রেনিংয়ে অনেক কষ্ট হইতেছে। তোমরা আমাদেরকে এখান থেকে উদ্ধার করার একটা ব্যবস্থা করো’- বাংলাদেশ থেকে বৈধভাবে রাশিয়ায় কাজের উদ্দেশে পাড়ি জমানোর পর দালালদের খপ্পরে পড়ে সেনাবাহিনীর কাছে ‘বিক্রি’ হওয়া ৩০ হতভাগ্য কর্মীর একজন এভাবেই তার স্বজনের কাছে খুদে বার্তা পাঠিয়েছে। তবে খুদে বার্তার এক সপ্তাহ অতিবাহিত হওয়ার পরও এসব বাংলাদেশী কর্মীকে উদ্ধারে গতকাল শুক্রবার রাত পর্যন্ত কোনো সুখবরই দিতে পারেনি রাশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাস।
এদিকে ৩০ কর্মী বিপদে পড়ার পর রাশিয়াগামী কোনো কর্মীর নামে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকরা জানিয়েছেন।
গতকাল কাকরাইলের ফ্লেয়ার ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মো: আনিসুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানের নামে রাশিয়ার পার্ম সিটি এলাকার প্রেটো কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কনস্ট্রাকশন কোম্পানি থেকে ২০০ কর্মীর নামে চাহিদাপত্র পাই। রাশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে কোম্পানি গ্যারান্টি লেটারসহ ডিমান্ড লেটার সত্যায়ন করে নিয়ে আসি। এর মধ্যে ৬৭ জনকে ওই কোম্পানিতে পাঠিয়েছি। তারা সবাই সুন্দরভাবে কাজ করছে। কোনো সমস্যা নেই। ঈদের আগে বিএমইটি থেকে ২১ জনের বহির্গমন ছাড়পত্র পেয়েছি। তাদের ভিসা স্ট্যাম্পিং এবং টিকিট কেনা হয়েছে। তারা আগামী ৮ জুন রাশিয়ার উদ্দেশে ফ্লাই করবে। বাকি ৫৭ জনের ভিসা অনলাইনে সাবমিট করেছি। এখন শুনছি বিএমইটি রাশিয়াগামী কর্মীদের ছাড়পত্র দেবে না। বিএমইটির পরিচালকের দফতর থেকে জানানো হয়েছে, আপাতত রাশিয়ার বহির্গমন ছাড়পত্র বন্ধ রাখতে মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা এসেছে।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যারা রাশিয়ায় লোক পাঠানোর নামে প্রতারণা করেছে তাদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করলে আমাদের কারো সমস্যা নেই। কিন্তু ২-৩ এজেন্সির কারণে সবার ব্যবসা বন্ধ থাকলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাবো। বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্টরা বিবেচনা করবেন। এমনিতেই আমাদের মধ্যপ্রাচ্যের অনেক শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে আছে। নতুন শ্রমবাজার রাশিয়া। এটি যাতে টিকে থাকে সেভাবে সরকারের পদক্ষেপ আশা করছি আমরা।
গত রাতে রাশিয়া পার্ম সিটি থেকে জহুরুল নামের একজন শ্রমিক নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা এখানে আসার পর ভালো আছি। থাকা খাওয়া এবং কাজের কোনো সমস্যা নেই। তবে শুনছি ৩০ জন শ্রমিকের সমস্যা হয়েছে।
এর আগে নয়াপল্টনের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক মনির হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা রাশিয়ায় অনেক শ্রমিক পাঠিয়েছি। কোনো সমস্যা হয়নি। তবে ৩০ জন শ্রমিকের সমস্যার পিছনে কোম্পানির গ্যারান্টি লেটার ছিল না বলে জেনেছি। আমরা যারা রাশিয়ায় ব্যবসা করি তারা আগামীকাল (আজ) অনলাইনে এ নিয়ে মিটিং করব।
এর আগে গতকাল শুক্রবার রাশিয়ার আর্মির হেফাজতে থাকা এক শ্রমিকের স্বজন নয়া দিগন্তকে বলেন, সর্বশেষ তথ্য হলো সেখান থেকে মেসেজ দিয়ে বলেছে, তাদেরকে যুদ্ধে পাঠানোর জন্য জোর করে রাশিয়ার আর্মিরা তাদের ক্যাম্পে ট্রেনিং করাচ্ছে। এর বাইরে তাদের উদ্ধারে কোনো ধরনের আর অগ্রগতির কথা শুনতে পাননি তারা।
রাশিয়ায় গিয়ে বিপদে পড়া কর্মীদের বিষয়টি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নজরে এলে ১ জুন
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ৩০ কর্মীকে প্রতারণামূলকভাবে রাশিয়ায় পাঠানোর সাথে জড়িত অভিযোগে তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার এবৎ জামানত বাতিলের নির্দেশ দেন। প্রত্যাহার হওয়া লাইসেন্সগুলো হচ্ছে আর এস ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-১৪২৮), জাবাল ই নূর (আরএল-২৫০৫) এবং টিএম ওভারসিস লিমিটেড (১৭৫৫)। এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, দেশের নাগরিকদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা এবং প্রতারণামূলকভাবে বিদেশে পাঠানোর মতো জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। কোনো এজেন্সির অসততার কারণে বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেয়া হবে না। তিনি বলেন, ৩০ কর্মীকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে গুরুত্বের সাথে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।



