কূটনৈতিক প্রতিবেদক
পুশইন ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে পুনরুদ্ধারে প্রভাব ফেলবে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তিনি বলেছেন, ভারতের পুশ-ইনের চেষ্টা বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) শক্তভাবে প্রতিহত করছে। নিয়ম না মেনে পুশ-ইনের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।
পুশইন বন্ধে ভারতকে ১২ থেকে ১৩টি চিঠি দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত দেয়ার প্রক্রিয়া আছে। সেটা মেনেই ভারতকে কাজ করতে হবে।
গতকাল সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী এ কথা বলেন। পুশইন বন্ধে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ভারতকে বারবার চিঠি দেয়া হলেও এতে কোনো কাজ হয়নি। বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন ভারতের তিন রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা দিয়ে জাতীয়তা যাচাইপ্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাভাষী মানুষদের পুশইন করা হচ্ছে। ভারতের এই তিন প্রদেশেই বর্তমানে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজ্য সরকার রয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের সাম্প্রতিক বিধান নির্বাচনের পর বিএসএফের পুশ-ইনের তৎপরতা ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। এই দুই রাজ্যের নির্বাচনী প্রচারণায় ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ ইস্যুর কার্ড খেলা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী, এমপি, দলীয় নেতা, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা ভারতে আশ্রয় নেয়। এরপর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরই ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। গত ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে বেশ ইতিবাচক বার্তা নিয়ে এগিয়ে আসে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বিধান সভা নির্বাচনে ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ ইস্যুর কার্ড খেলাকে কেন্দ্র করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা হোঁচট খায়, যা পুশইনের মতো ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে আরো জটিল হয়ে উঠেছে। দিল্লিতে গতকাল থেকে চার দিনের বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন শুরু হয়েছে। এতে সীমান্ত হত্যা, পুশইনের মতো ঘটনাগুলো গুরুত্বের সাথে আলোচনা হতে পারে।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী গত রোববার কলকাতার নিউ টাউনে বিজেপির প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে দাবি করেছেন যে, গত এক মাসে বাংলাদেশ থেকে আসা চার হাজার ৮০০ জন কথিত নথিবিহীন অভিবাসীকে রাজ্য থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে, বর্তমানে আটক কেন্দ্রে থাকা আরো ৮৩৬ জনকে শিগগির ফেরত পাঠানো হবে।
তার বক্তব্যটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন ক্রমবর্ধমান অভিযোগ উঠছে যে, যথাযথ প্রক্রিয়া, জাতীয়তা যাচাই বা আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসনের আদেশ ছাড়াই বাংলাভাষী মুসলিমদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসাবে বিতারিত করা হচ্ছে বা সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। গত ২২ মে রাজ্য সরকারের জারি করা একটি আদেশের পর এই আটক কেন্দ্রগুলো স্থাপন করা হয়েছিল, যেখানে কথিত নথিবিহীন অভিবাসী এবং কারাগার থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত বিদেশী নাগরিকদের রাখা হয়েছে।
এসব পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, একটি আইনি বিধান রয়েছে, যা অনুযায়ী কথিত নথিবিহীন অভিবাসীদের কারাগারে রাখার পরিবর্তে বিএসএফের হাতে তুলে দেয়া যায়। তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য বিএসএফকে জমি দিয়েছি। যারা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, আমরা তাদের চলে যেতে বলেছি। আমরা তাদের ওষুধ ও খাবার দিয়ে সম্মানিত অতিথির মতো আপ্যায়ন করব না।
পশ্চিমবঙ্গের পূর্ববর্তী প্রশাসনের সমালোচনা করে শুভেন্দু অভিযোগ করেন যে, আগে এই ধরনের ব্যক্তিদের অতিথি হিসেবে গণ্য করা হতো, কারাগারে রাখা হতো এবং রাষ্ট্রের খরচে তাদের খাদ্য, বস্ত্র ও চিকিৎসাসেবা দেয়া হতো। তিনি বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সীমান্তে প্রয়োজনীয় ৫৫৬ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়ার নির্মাণের জন্য প্রায় ১০০ কিলোমিটার জমি ইতোমধ্যেই বিএসএফকে হস্তান্তর করা হয়েছে।



