নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি পেশ করে বলেছেন, ইরানকে যুদ্ধ, হামলা ও বিক্ষোভে নিহতদের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। রয়টার্স লিখেছে, বাগাড়ম্বরের মধ্য দিয়ে এই উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে হরমুজ প্রণালী ফের খোলার প্রচেষ্টা জটিল হয়ে পড়তে পারে। এর আগে ট্রাম্প কখনোই এ ধরনের কোনো দাবি জানাননি। কিন্তু একটি শান্তি চুক্তির শর্ত হিসেবে তেহরান ক্ষতিপূরণ ও নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটনানোর দাবি পুনরাবৃত্তি করার পর ট্রাম্প এমন প্রতিক্রিয়া জানান।
ইরানের দাবিগুলো জুনে স্বাক্ষরিত একটি প্রাথমিক শান্তি চুক্তির শর্তাবলীর সাথে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল, কিন্তু দু’পক্ষের ওই সমঝোতা ভেঙে গেছে। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প একবার প্রবল হামলা চালিয়ে ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দিচ্ছেন, আবার পরক্ষণেই একটি শান্তি চুক্তি আসন্ন বলে দাবি করছেন। বারবার নিজের এই দোদুল্যমান অবস্থানের পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছেন তিনি।
সোমবার হোয়াইট হাউজে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা ৫০ বছর সময় ধরে যে ক্ষতি করেছে তার জন্য অর্থ চাইতে যাচ্ছি আমরা।’ তিনি জানিয়েছেন, এই ক্ষতিপূরণে ওই অঞ্চলে নিহত বেসামরিক বিক্ষোভকারী ও মার্কিন সেনাদের বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তাই যদি কোনো ক্ষতিপূরণ দিতেই হয়, আমার মনে হয় ইরানেরই ওইসব ক্ষতিপূরণ দেয়া উচিত,’ বলেছেন তিনি।
ট্রাম্প ২০২৫ ও ২০২৬ সালে বিক্ষোভকারীদের ওপর তেহরানের দমন-পীড়নের কথা উল্লেখ করে বলেন, ছয় সপ্তাহ আগে ইরান ‘৫২ হাজার বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছে’। ইরানের কিছু বিরোধীদল ও প্রবাসীগোষ্ঠীর দাবি, প্রায় লাখো মানুষ নিহত হয়েছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) ফেব্রুয়ারিতের দেয়া রিপোর্টে সাত হাজার জন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে, যাদের মধ্যে বিক্ষোভকারী ছয় হাজার ৫০০ জন। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আকাশ হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় ইরান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য বিক্ষোভকারীদের উৎসাহিত করেছিলেন ট্রাম্প। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো বলছে, ইরান সরকার ওই সময় থেকেই বিরোধীদের দমন করতে শুরু করে।
ট্রাম্প আরো বলেছেন, ২০০০ সালের অক্টোবরে ইয়েমেনে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কোল এ চালানো হামলায় যে ১৭ জন নৌ-সেনা নিহত হয়েছিল, তার জন্য ইরানের তাদের পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেয়া উচিত। যদিও ওই হামলার জন্য আল কায়েদাকে দায়ী করা হয়, ইরানকে নয়। ট্রুথ সোশ্যালের এক পোস্টে তিনি গাজা, লেবানন, সিরিয়া ও ইয়েমেনে হওয়া ক্ষয়ক্ষতি ও মানুষের মৃত্যুর জন্য ইরানকে দায়ী করেছেন।
ইরান এর আগে জানায়, হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে নতুন নৌ-চলাচলের পথ নির্ধারণের লক্ষ্যে ওমানের সাথে একটি চূড়ান্ত চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে তারা। কিন্তু এই চুক্তির সাথে হরমুজ ফের খুলে দেয়ার কোনো সম্পর্ক নেই জানিয়ে তেহরান বলেছে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি উন্মুক্ত করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই ইরানের শর্ত মানতে হবে, যার মধ্যে ক্ষতিপূরণ এবং নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হুমকির অবসান ঘটানো অন্যতম।
হরমুজে জাহাজ চলাচল কমেছে
ইরানের দৃষ্টিতে হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত ‘শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড’ নৌপথটিকে অনিরাপদ করে তুলেছে। ইরান হরমুজে মার্কিন নৌ অবরোধকে ‘আগ্রাসন’ হিসেবে বিবেচনা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, জুলাইয়ে অবরোধ পুনর্বহালের পর তারা ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে এবং অন্তত দু’টি জাহাজকে অকার্যকর করেছে। সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, এই অবরোধের কারণে ইরানের খার্গ দ্বীপ থেকে তেল রফতানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ট্রাম্প সোমবার হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন অবরোধকে ‘ইস্পাতের দেয়াল’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি দাবি করেন, বর্তমানে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ শুধু মার্কিন নৌবাহিনীর হাতে। তার আরো দাবি, মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রণালীটি মাইনমুক্ত করেছে এবং নৌপথটি উন্মুক্ত রয়েছে।
সামুদ্রিক পরিবহন-সংক্রান্ত তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার হরমুজ প্রণালী দিয়ে ১৫টি জাহাজ পার হলেও শনিবার তা কমে ১১টিতে এবং রোববার ছয়টিতে নেমে আসে। তথ্য অনুযায়ী, ১৭টি জাহাজ ইরান নির্ধারিত নৌপথ ব্যবহার করেছে। আরো ১০টি জাহাজ এমন একটি পথে চলেছে, যেটিকে নির্দিষ্ট কোনো রুট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। ফলে হরমুজ প্রণালী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি দাবি এবং নতুন ক্ষতিপূরণের চাপের মধ্যে জাহাজ চলাচল ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরো বাড়ছে। সোমবার তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে যায়। হরমুজ নিয়ে সম্ভাব্য সমঝোতার বিষয়ে প্রথম দিকের আশাবাদ ইরানের শর্তের কথা প্রকাশের পর কমে যায়। গ্রিনিচ মান সময় ১৭টা ২০ মিনিটে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ বেড়ে লেনদেন করছিল। নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্যের নিকটতম মেয়াদের গ্যাসের দামও ১০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়।
সোমবার হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় ট্রাম্প ইরানের সাথে সর্বশেষ দফার আলোচনার পর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা জানাতে অস্বীকৃতি জানান। এর আগে তিনি এই আলোচনাকে ইরানের জন্য ‘শেষ সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন এবং ব্যর্থ হলে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন। এক সাংবাদিক জানতে চান, ‘বিশাল মাত্রার সামরিক উত্তেজনা’ বা বড় ধরনের সামরিক অভিযান এখনো আলোচনায় রয়েছে কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, এমন পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলে যুক্তরাষ্ট্রের সেই সক্ষমতা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের সেই সক্ষমতা অবশ্যই রয়েছে, যদি আমরা সেটা করতে চাই।’



