২০১৮ ফিফা বিশ্বকাপে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছিল আর্জেন্টিনা। তখন অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে বিশ্বমঞ্চে লিওনেল মেসিকে হয়তো আর দেখা যাবে না। আট বছর পেরিয়ে এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন; সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার কেবল বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নই হননি, বরং এই যাত্রাপথে ভেঙেছেন অসংখ্য রেকর্ড। এখন ইন্টার মিয়ামির এই মহাতারকা আরো ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। ১৯ জুলাইয়ের ফাইনালে আর্জেন্টিনা যদি হারিয়ে দেয় স্পেনকে, তাহলে টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ী প্রথম অধিনায়ক হবেন এই মেসি।
ব্রাজিল ও ইতালি টানা দুইবার বিশ্বকাপ জিতেছিল। তবে তাদের কোনো অধিনায়কই পরপর দুই বিশ্বকাপে দলকে নেতৃত্ব দিতে পারেননি। ১৯৩৪ সালে চ্যাম্পিয়ন ইতালির অধিনায়ক ছিলেন গোলরক্ষক জিয়ানপেইরো কম্বি। আর ১৯৩৮ সালে বিশ্বকাপ জয়ী ইতালি দলের নেতৃত্ব দেন ফরোয়ার্ড জিওসেপ্পো মেসা। আর ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের নেতৃত্ব ছিলেন যথাক্রমে স্টপার ব্যাক লুইজ বেল্লিনি ও ডিফেন্ডার মাওরো রামোস। বেল্লিনিই প্রথম মাথার ওপর ট্রফি তুলে ধরা শুরু করেন যাতে ফটো সাংবাদিকরা ঠিকমতো ছবি তুলতে পারেন।
মেসি এরইমধ্যে আরেকটি রেকর্ড গড়তে যাচ্ছেন। যদি তিনি ফাইনালে খেলতে নামেন স্পেনের বিপক্ষে তাহলে প্রথম ফুটবলার হিসেবে তিন বিশ্বকাপের ফাইনালে দলকে নেতৃত্ব দেবেন। মেসি এর আগে ২০১৪ ও ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ছিলেন। আর ব্রাজিলের কাফুর পর বিশ্বকাপ ইতিহাসে দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে মাঠে নামবেন।
আর্জেন্টিনা যদি চ্যাম্পিয়ন হয়, তাহলে তা হবে টানা পাঁচটি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট শিরোপা জয়। তা ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে দ্বিতীয় রাউন্ডে বিদায় নেয়ার পর। এর মধ্যে আলবিসেলেস্তেরা দু’টি কোপা আমেরিকা ট্রফি (২০২১, ২০২৪) ও ২০২২ সালের কোপা ফিনালিসিমা এবং একই বছর বিশ্বকাপ জিতেছে। এবার বিশ্বকাপ জিতলে তা হবে পঞ্চম শিরোপা।
১৯ জুলাই পুরস্কার প্রদান মঞ্চে মেসির হাতে ট্রফি উঠলে আরেকটি অর্জনে ভাগ বসাবে আর্জেন্টিনার ১৭ ফুটবলার। যারা ২০২২-এর পর ২০২৬ বিশ্বকাপেরও জয়ী দলের সদস্য হবেন। তারা হলেন- লিওনেল মেসি, এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, জেরোনিমো রুল্লি, লাউতারো মার্টিনেজ, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরা, নিকোলাস ওতামেন্দি, নাহুয়েল মলিনা, নিকোলাস টাগলিয়াফিকো, রদ্রিগো ডি পল, লিয়ান্দ্রো পারেদেস, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, জিওভান্নি লো সেলসো, ইজ্জাকুয়েল প্যালাসিয়স, থিয়েগো আলমাদা ও গনজালো মন্টিয়েল। এ পর্যন্ত ২১ জন খেলোয়াড়ের টানা দু’টি বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব আছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন- ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলে ও গারিঞ্চা।
ইতোমধ্যে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ৪৭টি শিরোপা জিতে সর্বকালের সবচেয়ে সফল ফুটবলারের রেকর্ডটি আগেই নিজের দখলে রেখেছিলেন মেসি। এখন বিশ্বকাপ জিততে পারলে তা ৪৮-এ উন্নীত হবে। তার সর্বশেষ ট্রফি জয় ইন্টার মিয়ামির হয়ে ২০২৫-এর এমএলএস কাপ।
‘লা আলবিসেলেস্তেরা চ্যাম্পিয়ন হলেও তিন বিশ্বকাপ জয়ের ক্ষেত্রে পেলেকে ছুঁতে পারবেন না মেসি। পেলে ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০-এর এই তিন বিশ্বকাপ জেতা একমাত্র খেলোয়াড়। ফাইনালে স্পেনকে হারাতে পারলে আর্জেন্টিনা হবে ৬৪ বছরের মধ্যে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ী প্রথম দেশ। এর আগে ইতালি ১৯৩৪, ১৯৩৮ সালে এবং ব্রাজিল ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে পরপর চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।
এবারের বিশ্বকাপে খেলে ইতোমধ্যে যে রেকর্ডগুলোর মালিক হয়েছেন মেসি-
সর্বোধিক গোল : ২১
সর্বোধিক অ্যাসিস্ট : ১২
সর্বোধিক গোল অবদান (গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে) : ৩৩
সর্বোধিক ম্যাচ খেলা : ৩৩
টানা সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপে গোল করা ম্যাচ : ৯
বিশ্বকাপে সর্বাধিক ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কার : ১৫
সর্বাধিক বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট খেলার রেকর্ডে যৌথভাবে শীর্ষে : ছয়টি আসর
একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে একাধিকবার বিশ্বকাপ ‘গোল্ডেন বল’ জয় : ২০১৪ ও ২০২২
ছয়টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী তিনজন খেলোয়াড়ের মধ্যে মেসি অন্যতম। অন্য দু’জন হলেন- পর্তুগালের ফরোয়ার্ড ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং মেক্সিকোর গোলরক্ষক গুইলেরমো ওচোয়া। ওচোয়া অবশ্য ২০০৬ ও ২০১০ এই দুই বিশ্বকাপে খেলেননি দলের সাথে ছিলেন। আর রোনালদোর আগে এবারের বিশ্বকাপে মাঠে নেমে টানা ছয় বিশ্বকাপে খেলার রেকর্ড আগে করেছেন মেসি।



