হ্যাটট্রিক-কন্যা মুক্তগাছার মেসি

Printed Edition

রফিকুল হায়দার ফরহাদ

বাংলাদেশের নারী ফুটবল সিনিয়র এশিয়ান কাপ ও অনূর্ধ্ব-২০ পর্যায়ে এশিয়ার সেরা কাতারের। দুই বিভাগেই বাংলাদেশ সর্বশেষ এশিয়ান ফুটবলের চূড়ান্ত পর্বে খেলেছে। আর এই পথ দেখানোটা অনূর্ধ্ব-১৬ নারী দলের। তারা দুইবার অর্থাৎ ২০১৭ ও ২০১৯ সালে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলের চূড়ান্ত পর্বে খেলেছিল। সাফ শিরোপাও জিতেছে দুইবার। সাফের সব বয়সভিত্তিক আসরেও তাদের ট্রফি জয়। নারী দলের এই অর্জনে একাধিক ফরোয়ার্ডের অবদান। এদেরই একজন তহুরা খাতুন। ময়মনসিংহের মুক্তগাছার কলসিন্দুরের এই মেয়ে একই সাথে হ্যাটট্রিক কন্যা নামেও পরিচিত। বলতে গেলে সব আন্তর্জাতিক আসরেই তার রয়েছে হ্যাটট্রিক। বয়সভিত্তিক সাফের গণ্ডি পেরিয়ে এএফসির বয়সভিত্তিক আসরে হ্যাটট্রিক ছিল। এরপর সিনিয়র সাফের পর্ব শেষ করে সর্বশেষ তার এক ম্যাচে তিন গোল করা এবারের এএফসি নারী চ্যাম্পিয়ন্স লিগে। তার এই হ্যাটট্রিকের সুবাদেই নারী চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বাংলাদেশের প্রথম ক্লাব হিসেবে জয়ের দেখা পেয়েছে রাজশাহী স্টারস। ২৩ আগস্ট গুয়ামের রোভার্স এফসির বিপক্ষে ৮-০তে জয় রাজশাহীর দলটির। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে এ পর্যন্ত তার হ্যাটট্রিক আটটি। আন্তর্জাতিক ম্যাচে এ পর্যন্ত তার করা গোল ৫৯টি।

বঙ্গমাতা আন্তঃস্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট দিয়েই ফুটবলে আসা ছোটখাটো গড়নের এই স্ট্রাইকারের। কলসিন্দুর এলাকায় তিনি ছোটবেলায় ফুটবল খেলতেন ছেলেদের সাথে। তখন তার খেলার স্টাইল দেখে দর্শক এবং ফুটবলপ্রেমীরা তাকে মেসি বলে ডাকতেন। তহুরা জানান, ‘প্রথমে আমি রাগ করতাম আমাকে মেসি ডাকায়। আমি আসলে তখন জানতামই না মেসিকে। কারণ তখন খেলাইতো দেখতাম না। পরে বুঝলাম আমাকেতো বিশ^খ্যাত এক ফুটবলারের সাথে তুলনা করা হচ্ছে। গ্রামের মানুষ, আশপাশের মানুষ ভালোবেসেই মেসি বলে ডাকতো।’

২০১৫ সালে নেপালে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ রিজিওনাল ফুটবলে প্রথম বাংলাদেশ দলে অভিষেক তার। সে আসরে ভুটানের বিপক্ষে একটি গোল ছিল তার। বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলেরও প্রথম ট্রফি জয় সেই টুর্নামেন্টে। পরের বছর তাজিকিস্তানে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ রিজিওনাল ফুটবলেও চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। সেই প্রতিযোগিতায় নিজেকে মেলে ধরেন এই মুক্তগাছার মেসি। দুই হ্যাটট্রিকসহ চার ম্যাচে ১০ গোল তার। দুই হ্যাটট্রিক ছিল সেমিফাইনালে তাজিকিস্তান ও ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে। তহুরা জানান, ওই আসরের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকটি আমার স্মরণীয়। একেতো ফাইনাল ম্যাচ। তার উপর প্রতিপক্ষ ছিল ভারত।’ এরপর জানান, ‘আমি কিন্তু প্রথমে বুঝতাম না হ্যাটট্রিক কী। মনে করতাম হেড দিয়ে তিনটি গোল করলে বোধ হয় হ্যাটট্রিক হয়। অনেক পরে বুঝেছি ম্যাচে তিন গোল করলেইতো হ্যাটট্রিক।’ সে আসরে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন তহুরা।

২০১৭ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ টুর্নামেন্টে নেপালের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক ছিল তহুরার। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের মাঠে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলের দ্বিতীয় রাউন্ডে বাংলাদেশ ১০-০ গোলে হারিয়েছিল ফিলিপাইনকে। সেই ম্যাচে তহুরা করেছেন ৪ গোল।

২০১৮ সালে হংকংয়ের অনূর্ধ্ব-১৫ জকি কাপে অংশ নিয়েই চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। সে আসরে তহুরার হ্যাটট্রিক ছিল ইরান ও ফাইনালে হংকংকের বিপক্ষে।

বয়সভিত্তিক সাফে নেপালের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করার পর সিনিয়র সাফেও হ্যাটট্রিকের দেখা পেয়েছেন সর্বশেষ লিগে ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে খেলা এই ফরোয়ার্ড। ২০২৪ সালে নেপালে অনুষ্ঠিত সাফের সেমিতে তিনি তিন গোলের দেখা পান ভুটানের বিপক্ষে। এর আগে গ্রুপ পর্বে ভারতের বিপক্ষে দুইবার জালে বল পাঠান তিনি।

এএফসি নারী চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বাংলাদেশের ক্লাবের হয়ে প্রথম গোলের দেখা পেতেন তিনিই। কিন্তু মালয়েশিয়ার সাবাহ এফসির বিপক্ষে তার কোমরে লাগা বলকে রেফারি হ্যান্ডবলের বাঁশি বাজালে গোলবঞ্চিত হন। ফলে সেই ম্যাচে বাংলাদেশী ক্লাবের জার্সি গায়ে গোলের দেখা সুলতানার। অবশ্য শেষ ম্যাচে গুয়ামের রোভার্সের বিপক্ষে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেন তহুরা। ফের আন্তর্জাতিক ম্যাচে হ্যাটট্রিক তার। তবে এই হ্যাটট্রিকের পরও তহুরার অসন্তুষ্টি দল কোয়ালিফাই করতে না পারায়। প্রথম দুই ম্যাচে হেরেই ছিটকে পড়া। তহুরা জানান, ‘ইস্টবেঙ্গলের সাথে প্রথম ম্যাচে আমরা ১৮ ঘণ্টার ভ্রমণ শেষে মালয়েশিয়ার সাবাহতে পৌঁছে একদিন পরেই খেলতে নামি। আমরা খুবই ক্লান্ত ছিলাম। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচে সাবাহর বিপক্ষে আমার বৈধ গোল রেফারি হ্যান্ডবল বলে বাতিল করেন।’ যোগ করেন, দুই হারের পর পণ করেছিলাম শেষ ম্যাচটা আমরা বড় ব্যবধানে জিতবোই। শেষ পর্যন্ত জয়েই শেষ করেছি আসর।’

এটিই তহুরার প্রথম এএফসি নারী চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলা নয়। গত বছর ভুটানের রয়্যাল থিম্পু কলেজের হয়ে লাওসের মাঠে খেলেছিলেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচ। সেবার অবশ্য কোনো গোল পাননি। এবার নিজ দেশের ক্লাবের হয়েই এএফসির ক্লাব ফুটবলে গোলের দেখা পান তিনি।

তহুরার স্মরণীয় গোল ২০২৪ এর সাফের গ্রুপ পর্বে ভারতের বিপক্ষে ভলিতে করা গোল এবং ২০১৯ সালে থাইল্যান্ডের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে করা জোড়া গোলে। সেই ম্যাচে তহুরা দুই গোলেই দুই দফা লিড নেয় গোলাম রাব্বানী ছোটনের দল। নারী ফুটবলে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্রও সেবার, যা নারী ফুটবল ইতিহাসে এএফসির আসরের চূড়ান্ত পর্বে প্রথম পয়েন্টের দেখা পাওয়া লাল-সবুজ নারীদের।