বাংলাদেশের অর্থনীতিতে করছাড়, ট্যাক্স হলিডে ও শুল্কমুক্ত সুবিধা নতুন কোনো বিষয় নয়। শিল্পায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রফতানি সম্প্রসারণের যুক্তিতে সরকার বিভিন্ন সময়ে নানা খাতকে কর অব্যাহতি ও শুল্ক সুবিধা দিয়ে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্ন উঠেছে, এসব সুবিধার প্রকৃত উপকারভোগী কারা। রাষ্ট্র যে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, তার বিপরীতে দেশের অর্থনীতি কতটুকু লাভবান হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন করছাড় ও শুল্কমুক্ত সুবিধার বড় অংশ চলে যাচ্ছে কিছু প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের হাতে, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ কর ব্যয় (ট্যাক্স এক্সপেন্ডিচার) প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন কর অব্যাহতি, রেয়াত ও ছাড়ের কারণে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় এক লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ অর্থের পরিমাণ দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বড় একটি অংশের সমান। এই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও অবকাঠামো খাতে আরো বড় বিনিয়োগ করা সম্ভব হতো বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, করছাড়ের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, তৈরি পোশাক শিল্প এবং বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান। গত এক দশকে বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে একাধিক কোম্পানিকে দীর্ঘমেয়াদি ট্যাক্স হলিডে দেয়া হয়েছে। একইভাবে তৈরি পোশাক খাত রফতানি উৎসাহিত করতে কর রেয়াত, উৎসে করের নিম্নহার, বন্ড সুবিধা ও শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পেয়ে আসছে। এছাড়া ইলেকট্রনিক্স, মোবাইল ফোন সংযোজন, শিল্প যন্ত্রপাতি এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থাপিত কারখানাগুলোও ব্যাপক কর সুবিধা ভোগ করছে।
এসব সুবিধার কারণ হিসেবে সরকারের যুক্তি হচ্ছে, কর ছাড়ের সুবিধার ফলে বিদেশী ও দেশীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ বলছেন, করছাড় দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কার্যকর মূল্যায়ন ব্যবস্থা নেই। কোনো খাতকে ৫ বা ১০ বছরের কর অব্যাহতি দেয়ার পর তার বিনিময়ে কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো, কত নতুন বিনিয়োগ এলো, কত প্রযুক্তি স্থানান্তর ঘটল কিংবা কত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হলো সেসবের নির্ভরযোগ্য হিসাব খুব কম ক্ষেত্রেই প্রকাশ করা হয়।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশে কর অব্যাহতির সংস্কৃতি অনেক ক্ষেত্রে নীতিগত প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বিস্তৃত হয়েছে। করছাড়ের মাধ্যমে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা যেতে পারে, তবে এর কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন না করলে তা বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর জন্য স্থায়ী সুবিধায় পরিণত হওয়ার ঝুঁঁকি থাকে। তিনি বলেন, কর অব্যাহতির প্রতিটি সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক ফলাফল পরিমাপ করা জরুরি। একটি প্রতিষ্ঠান বা খাত বছরের পর বছর কর সুবিধা ভোগ করলেও যদি প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান বা উৎপাদন বৃদ্ধি না ঘটে, তাহলে সেই সুবিধা পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হচ্ছে একদিকে কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের সর্বনিম্ন দেশগুলোর মধ্যে একটি, অন্য দিকে বিপুল পরিমাণ কর অব্যাহতি বহাল রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই ৮ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয় পরিচালনার জন্য সরকারকে দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে।
এদিকে রাজস্ব ঘাটতি পূরণে সরকার ক্রমশ পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও আমদানি পর্যায়ের কর থেকে রাজস্বের বড় অংশ সংগ্রহ করা হচ্ছে। অর্থাৎ বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী করছাড়ের সুবিধা পেলেও সাধারণ মানুষ বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়ে ভ্যাট ও অন্যান্য করের চাপ বহন করছে।
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, কর ব্যবস্থায় ন্যায়সঙ্গত ভারসাম্য নিশ্চিত না হলে আয় বৈষম্য আরো বাড়বে। তিনি বলেন, প্রত্যক্ষ করের পরিবর্তে অতিরিক্ত ভ্যাটনির্ভর রাজস্ব ব্যবস্থা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি করে। কারণ একজন ধনী ও একজন দরিদ্র ব্যক্তি একই পণ্য কিনলে প্রায় একই হারে ভ্যাট পরিশোধ করেন।
এদিকে খাত-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, করছাড়ের প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হচ্ছে তথাকথিত ‘ক্রনি ক্যাপিটালিজম’ বা পছন্দের ব্যবসায়ী তোষণ। তাদের মতে, যখন কোনো খাত বা প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ সুবিধা দেয়া হয় কিন্তু তার যৌক্তিকতা, ফলাফল বা জবাবদিহি স্পষ্ট থাকে না, তখন সেখানে বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাবের অভিযোগ ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কর অব্যাহতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নতুন নামে বা নতুন বিধানের আওতায় একই ধরনের সুবিধা অব্যাহত থাকে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ নয়া দিগন্তকে বলেন, কর অব্যাহতির একটি বড় অংশ মূলত কয়েকটি খাত ও বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত। যদিও এসব সুবিধা প্রদানের পেছনে অর্থনৈতিক যুক্তি রয়েছে, তবুও বাস্তব ফলাফল পর্যালোচনা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে তা অব্যাহত রাখা রাজস্ব ব্যবস্থার জন্য ঝুঁঁকিপূর্ণ হতে পারে। তিনি বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি পূর্ণাঙ্গ ‘করছাড় মূল্যায়ন কাঠামো’ তৈরি করা। যেখানে প্রতিটি খাতের জন্য নির্ধারিত থাকবে কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে, কত বিনিয়োগ আনতে হবে এবং কত রফতানি আয় অর্জন করতে হবে। নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর সুবিধা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, বাংলাদেশ এখনো শিল্পায়নের পর্যায়ে রয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কর প্রণোদনা প্রয়োজন। তবে তারাও স্বীকার করছেন, করছাড়ের কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং অপ্রয়োজনীয় সুবিধা প্রত্যাহারের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করছাড় ও শুল্কমুক্ত সুবিধা কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন এসব সুবিধার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না এবং রাষ্ট্র বিপুল রাজস্ব হারিয়েও তার যথাযথ প্রতিদান পায় না। রাজস্ব ঘাটতি মোকাবেলায় ভ্যাট বাড়ানো হচ্ছে, বিভিন্ন সেবার খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। তবে করছাড়ের প্রকৃত উপকারভোগী কারা এবং তারা দেশের অর্থনীতিতে কী অবদান রাখছে সেই প্রশ্নের স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক উত্তর দেয়ার সময় এসেছে। কর ব্যবস্থায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে হাজার কোটি টাকার করছাড় নিয়ে বিতর্ক আরও গভীর হবে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে বলে তারা মনে করছেন।



