ক্রীড়া প্রতিবেদক
ওয়ানডে সিরিজে মিরাজ কোনো ম্যাচে টস না জিতলেও সাগরিকায় সিরিজের প্রথম টি-২০তে জিতে আগে বোলিং করার সিদ্ধান্ত নেন বাংলাদেশ অধিনায়ক লিটন দাস। এতে সাফল্যও পেয়েছেন। ২০২৮ সালের বিশ্বকাপ পর্যন্ত নেতৃত্ব পাওয়া লিটন দাসের শুরুটা হলো জয় দিয়ে। দুই ওভার বাকি থাকতে ৬ উইকেটের রেকর্ডগড়া দাপুটে জয়ে শুরু হলো বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড টি-২০ সিরিজ।
যেখানে শেষ করেছিল বাংলাদেশ, সেখান থেকেই যেন নতুন সূচনা করল টাইগার বাহিনী। চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে আয়ারল্যান্ডকে গত বছর হারানোর পর বাংলাদেশ গতকাল হারাল নিউজিল্যান্ডকেও। লিটন দাসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ৬ উইকেটে জিতে তিন ম্যাচের টি-২০ সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে রইল। পরের ম্যাচ আগামীকাল ২৯ এপ্রিল একই ভেনুতে।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এই নিয়ে চারবার টি-২০তে রান তাড়া করে জয়ের কীর্তি গড়ল বাংলাদেশ। সিরিজের প্রথম টি-২০তে তারা কিউইদের দেয়া ১৮৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করে জিতে ভেঙে দিয়েছে ২৮ মাসের পুরনো রেকর্ড। এর আগে ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৩৫ রান তাড়া করে জয়ের কীর্তি গড়েছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচটি হয়েছিল নেপিয়ারে। এবার ১৮৩ রান টপকালো। গতকাল ১১ হাজার কিলোমিটার দূরে ২৮ মাস পর চট্টগ্রামে ঘরের মাঠে নতুন রেকর্ড গড়ল বাংলাদেশ।
এই তো ক’দিন আগে এই চট্টগ্রামে গত ২৩ এপ্রিল সিরিজের তৃতীয় ওয়ানডেতে মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড। সেই ম্যাচে চট্টগ্রামের গ্যালারি খাঁ খাঁ করছিল। তীব্র গরমে বেলা ১১টায় শুরু হওয়ায় দর্শকদের উপস্থিতি ছিল কম। এরপরই বিসিবি প্রথম দুই টি-২০র টিকিটের দাম কমিয়ে দেয়। আর বিকেলে ম্যাচ হওয়ায় সাগরিকায় দর্শকদের উপস্থিতি ছিল বেশি। তৌহিদ হৃদয়-শামীম পাটোয়ারীর একেকটি চার-ছয়ে গ্যালারি থেকে শোনা যাচ্ছিল উল্লাসধ্বনি। ধারাভাষ্য কক্ষে থাকা আতহার আলী খানও নিজের উত্তেজনা ধরে রাখতে পারেননি। দর্শকদের আনন্দে ভাসিয়ে লিটনের দল ২ ওভার হাতে রেখে ৬ উইকেটে আয়েশী জয় পেয়েছে।
১৮৩ রানের লক্ষ্যে সাবলীল শুরু করেন বাংলাদেশের দুই ওপেনার সাইফ হাসান ও তানজিদ হাসান তামিম। নিউজিল্যান্ডের বোলাররাও লাইন-লেংথ হারিয়ে ফেলেন। পাওয়ার প্লের মধ্যেই বাংলাদেশকে প্রথম ধাক্কা দেয় নিউজিল্যান্ড। ষষ্ঠ ওভারের তৃতীয় বলে সাইফকে (১৭) ফিরিয়ে জুটি ভাঙেন নাথান স্মিথ।
সাইফ ফেরায় বাংলাদেশের স্কোর ৫.৩ ওভারে ১ উইকেটে ৪১ রান। তিন নম্বরে ব্যাটিংয়ে নামেন অধিনায়ক লিটন। তবে আরেক ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম (২০) ও লিটন (২১) কেউই ইনিংস বড় করতে পারেননি। টপ অর্ডারের তিন ব্যাটারের বিদায়ে বাংলাদেশ ১০.১ ওভারে ৩ উইকেটে ৭৭ রানে পরিণত হয়। ওভারপ্রতি প্রায় ১১ রান করে যখন প্রয়োজন, তখন ব্যাটিংয়ে নামেন পারভেজ হোসেন ইমন। তৌহিদ হৃদয় ও ইমনের পাল্টা আক্রমণে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় নিউজিল্যান্ডের বোলিং লাইনআপ। চতুর্থ উইকেটে ২৮ বলে ৫৭ রানের জুটি গড়েন তারা। ১৫তম ওভারের পঞ্চম বলে ইমনকে ফিরিয়ে জুটি ভাঙেন জশ ক্লার্কসন। ১৪ বলে ১ চার ও ২ ছক্কায় ২৮ রান করা ইমনের বিদায়ে বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়ায় ১৪.৫ ওভারে ৪ উইকেটে ১৩৪ রান।
ওভারপ্রতি তখন ১০-এর কম রান দরকার হলেও হুড়মুড়িয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ ধসে পড়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে এবার আর তা হতে দেননি শামীম-হৃদয়। পঞ্চম উইকেটে ২১ বলে ৪৯ রানের অবিচ্ছেদ্য জুটি গড়েন তারা। যেখানে ১৭তম ওভারে বোলিংয়ে আসা কিউই পেসার ২৫ রান দিলে ৩ ওভারে ৫ রানের সমীকরণের সামনে এসে পড়ে বাংলাদেশ। সেই ওভারে শামীম তিন চার ও এক ছক্কা মেরেছেন শামীম। যার মধ্যে দু’টি চার তিনি মেরেছেন ফিশারের করা নো বল থেকে। ২ ওভার হাতে রেখে ৬ উইকেটের আয়েশি জয়ে ম্যাচসেরা হন হৃদয়। চার নম্বরে নেমে ২৭ বলে ২ চার ও ৩ ছক্কায় ৫১ রান করে অপরাজিত থাকেন। আন্তর্জাতিক টি-২০তে এটা তার ষষ্ঠ হাফসেঞ্চুরি।
এর আগে বাংলাদেশের হয়ে অভিষেক হয়েছে ২৩ বছরের পেসার রিপন মণ্ডলের। ২০২৩ সালের অক্টোবরে এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ দলের হয়ে তিনটি ম্যাচ খেলেছিলেন। নিউজিল্যান্ডের হয়ে টস করেন নিক কেলি। ৫টি টি-২০ খেলা এই ব্যাটসম্যানকে আচমকাই অধিনায়কত্ব করতে হয়েছে। আগের দিন অনুশীলনে পায়ে চোট পাওয়ায় একাদশে ছিলেন না নিয়মিত অধিনায়ক টম ল্যাথাম। টস হেরে আগে ব্যাটিং পেয়ে নিউজিল্যান্ড তাণ্ডব চালাচ্ছিল বাংলাদেশের ওপর। টস জিতে বোলিং বেছে নেয়া শুরুটা ভালো স্বাগতিকদের হয়নি। দ্বিতীয় ওভারে টিম রবিনসনকে রানআউট করলেও পাওয়ার প্লে খুব ভালো কাজে লাগিয়ে ফেলেন ক্যাটেন ক্লার্ক ও ডেন ক্লেভার। ওভারপ্রতি ১০ করে রান তুলতে থাকেন তারা। প্রথম ৬ ওভারে আসে ১ উইকেটে ৬১ রান।
পাওয়ার প্লের পরও ছুটতে থাকে রানের স্রোত। দশম ওভারে গিয়ে এই জুটি ভাঙতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। ফিফটি করা ক্লেভারকে এলবিডব্লিউতে থামান রিশাদ হোসেন। খানিক পর থামেন ক্লার্কও। তিনিও রিশাদের শিকার। ফিফটি তুলে হৃদয়ের হাতে জমা পড়েন ডানহাতি ব্যাটার। প্রথম দুই ওভারে খরুচে থাকা তানজিম হাসান সাকিব এসে বেভন জ্যাকবসকে থামলে নিউজিল্যান্ডের রানের গতি থমকে যায়। ওয়ানডে সিরিজে কিউইদের হিরো ডেন ফক্সক্রফট টি-২০তে এসে ছন্দ পাননি। শেখ মাহেদীর বলে বোল্ড হন মাত্র ৩ রান করে। একপর্যায়ে দুইশো ছাড়ানোর আভাস দিতে থাকা সফরকারীদের সীমানা ছোট হয়ে যায়। অধিনায়ক নিক কেলি (২৭ বলে ৩৯) ও জশ ক্লার্কসেনের ১৪ বলে ২৭ রানে ১৮০ ছাড়িয়ে যেতে পারে তারা। অবশ্য টাইগার ফিল্ডাররা দু’টি ক্যাচ না ছাড়লে আরো ছোট হতো কিউইদের ইনিংস।
প্রথম টি-২০তে অধিনায়ক লিটন দাস একের পর এক বোলার পরিবর্তন করেও সফল হচ্ছিলেন না। প্রথম ১০ ওভারে ২ উইকেটে ১০০ রান করে নিউজিল্যান্ড। ম্যাচের প্রথম অংশ যদি হয় নিউজিল্যান্ডের, দ্বিতীয় অংশটা তবে বাংলাদেশের। ২০ ওভারে ৬ উইকেটে ১৮২ রান করে কিউইরা। ক্লার্ক, ক্লিভার দু’জনই ৫১ রান করেছেন। বাংলাদেশের রিশাদ হোসেন ৪ ওভারে ৩২ রানে নিয়েছেন ২ উইকেট। একটি করে উইকেট নিয়েছেন শরীফুল, মেহেদী হাসান ও তানজিম সাকিব। ফ্লাডলাইট বিভ্রাটের কারণে মাঝে অবশ্য ১২ মিনিট খেলা বন্ধ ছিল।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
নিউজিলথ্যান্ড : ১৮২/৬ (ক্লার্ক ৫১, রবিনসন ০, ক্লেভার ৫১, কেলি ৩৯, জথ্যাকবস ১, ফক্সক্রফট ৩, ক্লার্কসন ২৭*, স্মিথ ২*; শরিফুল ১/৩৬, তানজিম ১/৪০, রিপন ০/৩৯, মেহেদী ১/৩১, রিশাদ ২/৩২)।
বাংলাদেশ : ১৮ ওভারে ১৮৩/৪ (সাইফ ১৭, তানজিদ ২০, লিটন ২১, হৃদয় ৫১*, পারভেজ ২৮, শামীম ৩১*; স্মিথ ১/৩৩, সোধি ২/৪০, ক্লার্কসন ১/২৮)।
ফল : বাংলাদেশ ৬ উইকেটে জয়ী।
সিরিজ : ৩ ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ১-০তে এগিয়ে।
ম্যাচ সেরা : তৌহিদ হৃদয়।



