ব্যাংকিং খাত মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি ব্যবস্থা। একজন আমানতকারী যখন তার কষ্টার্জিত অর্থ কোনো ব্যাংকে জমা রাখেন, তখন তিনি শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নয়, বরং পুরো ব্যাংকিংব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখেন। এই আস্থাই ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কোনো ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, মূলধন বা সম্পদের পরিমাণ যত বড়ই হোক না কেন, যদি গ্রাহকদের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে সেই ব্যাংক বড় ধরনের সঙ্কটে পড়তে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে আবারো স্পষ্ট হয়েছে যে ব্যাংকিং খাতে আস্থা রক্ষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম তদারকি করে, সুশাসন নিশ্চিত করার চেষ্টা করে এবং কোনো ব্যাংকে অনিয়ম, দুর্নীতি বা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দেখা দিলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সাধারণত কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সুশাসনের ঘাটতি বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়। এরপরও পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন বা ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়। এসব পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য থাকে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংকটিকে স্থিতিশীল রাখা।
কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা খুরশিদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গ্রাহকদের বিভিন্ন ফোরাম এবং ব্যাংক সংশ্লিষ্ট মহলে তার নিয়োগ নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। অনেক গ্রাহক অভিযোগ করছেন, তিনি অতীতে এস আলম গ্রুপের সাথে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এ ছাড়া তার ব্যক্তিগত আর্থিক লেনদেন এবং কর্মজীবনের কিছু বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত বা বিচারিক রায় নেই, তবুও অভিযোগগুলো সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ব্যাংকিং খাতে অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে ধারণা বা ‘পারসেপশন’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, সেটি একটি বিষয়; কিন্তু সেই ব্যক্তিকে ঘিরে যদি ব্যাপক বিতর্ক থাকে এবং তা যদি গ্রাহকদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তাহলে সেটিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ ব্যাংকের গ্রাহকরা সব সময় আইনি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেন না; বরং তারা নিজেদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকটি দেশের রেমিট্যান্স, আমানত এবং বিনিয়োগ খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ ৭ বছরে (২০১৭-২০২৪ আগস্ট) এস আলম গ্রুপের প্রভাব বিস্তার, ঋণ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ব্যাংকটির ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন ব্যবস্থাপনার অধীনে ব্যাংকটিকে পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেয়ায় ব্যাংকটি আবার ঘুড়ে দাঁড়ায়। এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে গ্রাহকের আস্থা অর্জন। যদিও এস আলম গ্রুপ ও নাসা গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা অন্য ৫টি ইসলামী ধারার ব্যাংক গ্রাহকের প্রয়োজনীয় অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক এই চারটি ব্যাংক ২০২৪ সালের আগে নিয়ন্ত্রণ ছিল এস আলম গ্রুপের। অপর দিকে নাসা গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল এক্সিম ব্যাংক। ইসলামী ধারার এ ৫টি ব্যাংকে তারল্য সঙ্কটের কারণে গ্রাহকদের টাকা উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। অনেক গ্রাহক তাদের প্রয়োজনীয় অর্থ সময়মতো তুলতে পারছেন না। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমন একটি সময়ে ইসলামী ব্যাংকের নেতৃত্বে গ্রাহকের কাছে আস্থাহীনতায় থাকা একজনকে নিয়োগ দেয়ায় সাধারণ গ্রাহকের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
ব্যাংক খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, কোনো ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব শুধু পরিচালনা পর্ষদের সভা পরিচালনা করা নয়; তিনি ব্যাংকের ভাবমর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতারও প্রতীক। একজন চেয়ারম্যানের অতীত, ব্যক্তিগত সুনাম এবং পেশাগত গ্রহণযোগ্যতা সরাসরি ব্যাংকের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই সঙ্কটের সময়ে এমন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয়া প্রয়োজন, যিনি সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য এবং যার নিয়োগ নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন ওঠার সুযোগ কম থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংকের কিছু শাখা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমানত উত্তোলন করা হয়েছে। যদিও ব্যাংকিং খাতে বড় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আমানত ওঠানামা একটি স্বাভাবিক বিষয়, তবে ধারাবাহিকভাবে গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে তা ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ইতিহাস বলছে, অনেক সময় শক্তিশালী ব্যাংকও গুজব ও আস্থার সঙ্কটের কারণে সমস্যায় পড়েছে। ফলে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সঙ্কট মোকাবেলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বচ্ছতা। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের উচিত গ্রাহকদের সামনে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা যে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে কী ধরনের যাচাই-বাছাই করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বাস্তবতা কী। যদি অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন হয়, তাহলে তা তথ্য-প্রমাণসহ জনগণের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। আর যদি কোনো অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; বরং ব্যাংকের আর্থিক অবস্থান, তারল্য পরিস্থিতি এবং পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করতে হবে। গ্রাহকরা জানতে চান তাদের অর্থ কতটা নিরাপদ এবং ব্যাংক ভবিষ্যতে কিভাবে এগিয়ে যাবে। এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারলেই আস্থা পুনর্গঠন সম্ভব হবে। তবে অনেক গ্রাহকের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিতর্কের অবসান ঘটাতে চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। তাদের মতে, এমন একজন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয়া উচিত যার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বিতর্ক নেই এবং যিনি ব্যাংক খাতের সংস্কার ও সুশাসনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হন। এতে গ্রাহকদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা যাবে এবং ব্যাংক থেকে আমানত প্রত্যাহারের প্রবণতাও কমে আসবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কারণ ইসলামী ব্যাংক শুধু একটি ব্যাংক নয়; এটি দেশের লাখ লাখ আমানতকারী, প্রবাসী এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত। এ ব্যাংককে ঘিরে কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিটি পদক্ষেপ এমন হতে হবে, যা গ্রাহকদের আস্থা বাড়াবে, কমাবে না।
যদিও ইতোমধ্যে বাজেট পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংকে পাঁচজনের একটি বোর্ড ছিল। একজনের ব্যাপারে কিচু অনিয়মের অভিযোগ থাকায় গত মার্চে বাদ দেয়া হয়েছে। ঈদের আগের দিন সকাল থেকে দেখলাম তৎকালীন চেয়ারম্যানের পদত্যাগ চাওয়া হচ্ছে। তিনি বিকেলে পদত্যাগ করেন। যেহেতু ৫ জনের একটি বোর্ড, চেয়ারম্যানের পদত্যাগের কারণে আমাদের তাৎক্ষণিকভাবে একজনেেক নিয়োগ দিতে হয় অল্প সময়ের মধ্যে, যা আমাদের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। আমরা আশা করছি বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নিয়মকানুন আছে, কিছু উপকরণ আছে। সেগুলো আগামী কয়েক দিনের মধ্যে প্রয়োগ করব। আমরা মনে হয় না, আমানতকারীদের কোনো অসুবিধা হবে, তারা যে কোনো সময় আমানত তুলতে পারবেন। এটাতে কোনো সমস্যা নেই।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের ব্যাংক খাতে সুশাসনের ঘাটতি, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। এসব ঘটনার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে এক ধরনের সঙ্কয় তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক সেই আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত যদি জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি বা উদ্বেগ তৈরি করে, তাহলে সেটি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনগণের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস একবার নষ্ট হলে তা পুনরুদ্ধার করতে অনেক সময় ও প্রচেষ্টা প্রয়োজন হয়। ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে বর্তমান বিতর্কের ক্ষেত্রেও মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত আমানতকারীদের স্বার্থ এবং ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা। তাই এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত নয়, যা গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সর্বজনগ্রাহ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগই হতে পারে সঙ্কট উত্তরণের সবচেয়ে কার্যকর পথ। ব্যাংকিংব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে আস্থার সঙ্কট সৃষ্টির পথ পরিহার করাই হবে সবচেয়ে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।



