আসাদুজ্জামান ভালুকা (ময়মনসিংহ)
ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার কাদিগড় ও উথুরা নামের দুই বন রেঞ্জে শতাধিক লাইসেন্সবিহীন করাতকল (স’মিল) নির্বিঘেœ চলছে। এসব করাতকলে দিন-রাত চেরাই হচ্ছে শাল, গজারি ও আকাশমনি গাছের কাঠ। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে সংঘবদ্ধ একটি চক্র সরকারি বনাঞ্চল থেকে গাছ কেটে এসব করাতকলে সরবরাহ করছে। এতে কাদিগড় জাতীয় উদ্যানসহ বিভিন্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চল উজাড় হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, হবিরবাড়ি বিট অফিসের অদূরে গজারি বনের ভেতর, কাচিনা, বাটাজোর, তামাট, মল্লিকবাড়ি, মাস্টারবাড়ি, কাশরগড়, উথুরা, চামিয়াদী, কৈয়াদী, ভরাডোবা, আঙ্গারগাড়া ও ডাকাতিয়া চৌরাস্তা এলাকায় অর্ধশতাধিক লাইসেন্সবিহীন করাতকল রয়েছে। এর মধ্যে কাদিগড় জাতীয় উদ্যানের এক থেকে আড়াই কিলোমিটারের মধ্যে বাটাজোর, কাচিনা ও তামাট বাজারেই রয়েছে অন্তত ২০টি।
২০১০ সালের ২৪ অক্টোবর পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের আদেশে ভালুকার কাচিনা ইউনিয়নের পালগাঁও এলাকায় ৮৫০ একর সংরক্ষিত বনভূমিকে কাদিগড় জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। পুরনো শাল-গজারি গাছে সমৃদ্ধ এ উদ্যানে বন উজাড়ের কারণে জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, রাতে উদ্যান ও আশপাশের বনাঞ্চল থেকে গাছ কেটে ঘোড়ার গাড়ি ও বিভিন্ন যানবাহনে করে বাটাজোরসহ আশপাশের করাতকলে নেয়া হয়।
কাদিগড় মৌজার ৩৮৩ নম্বর দাগে তালাব দক্ষিণপাড়া মরাপুড়া সেতুর উত্তর ও পশ্চিমে কয়েকটি চালা থেকে বড় গজারি গাছ কেটে নেয়ার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রথমে গাছের গোড়ার অংশের ছাল তুলে গাছ মেরে ফেলা হয়। পরে শুকিয়ে গেলে সেগুলো কেটে করাতকলে চেরাই করে বিক্রি করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গাছ কেটে ফাঁকা জায়গা দখল করে বাঁশঝাড় ও বিভিন্ন ফসলের বাগান করা হচ্ছে।
বন আইনে বনাঞ্চলের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপন নিষিদ্ধ হলেও জাতীয় উদ্যানের কাছাকাছি এলাকায় এসব করাতকল নির্বিঘেœ চলছে। স্থানীয়রা বলছে, বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করেই বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে মিল মালিকরা। অনেক করাতকল মালিকের নিজস্ব ফার্নিচারের দোকান থাকায় চোরাই কাঠ সহজেই সেখানে ব্যবহার ও বিক্রি করা হয়।
কাদিগড় বন বিট অফিস থেকে মাত্র এক-দেড় কিলোমিটার দূরে বাটাজোর বাজারে আতিক মন্ডল, পলাশ তালুকদার, সেলিম তালুকদার, ইমরুল তালুকাদার, জাহাঙ্গীর মেম্বার, নয়ন মিয়া ও পাপনের মালিকানাধীন অবৈধ করাতকল ছাড়া আরো সাত-আটটি করাতকলে প্রকাশ্যেই চেরাই করা হচ্ছে বনের গাছ। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই এ কর্মজজ্ঞ চলে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে বন বিভাগের কর্তারা বলছেন, এ ব্যাপারে তারা কিছুই জানেন না। শুধু কাচিনা আর বাটাজোরই নয়, জাতীয় উদ্যানের মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে তামাট বাজারে শাহীন মেম্বারের মালিকানাধীন করাতকলসহ তিনটি করাতকলে রাতদিন বনের গাছ চেরাই করা হয়। ক্রমাগত গাছ কাটার ফলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে জাতীয় উদ্যানের সৌন্দর্য ও ধ্বংস হচ্ছে জাতীয় সম্পদ।
স্থানীয়রা আরো জানায়, বন উজাড়ের কারণে মেছোবাঘ, লজ্জাবতী বানরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলও ক্রমান্বয়ে সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত অবৈধ করাতকল বন্ধ ও বনাঞ্চল রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে কাদিগড় বিট কর্মকর্তা জলিলুর রহমান বলেন, কাদিগড় বিটের আওতায় থাকা কোনো করাতকলেরই লাইসেন্স নেই। তবে ‘লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও এসব করাতকল কীভাবে চলছে’- এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি তিনি। করাতকল থেকে মাসোহারা নেয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।



