মার্কিন স্থল হামলাকে ‘স্বাগত’ জানাতে প্রস্তুত ইরান

দুই সপ্তাহে প্রায় ১০০ মার্কিন সেনা আহত : পেন্টাগন

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

জর্দান ও ইরাকে মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) টানা দশম রাতের মতো ইরানে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যেই তেহরান ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি স্থল আক্রমণ চালায়, তবে সেটিকে তারা ‘স্বাগত’ জানাতে প্রস্তুত।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেন, দেশটির নেতৃত্ব মার্কিন বাহিনীর সম্ভাব্য যেকোনো স্থল আগ্রাসনকে ‘স্বাগত জানাতে অপেক্ষার প্রহর গুনছে।’ তিনি আরো বলেন, জুন মাসে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির পাঠ ‘সম্পূর্ণ স্পষ্ট’ এবং ওয়াশিংটনের সেই চুক্তি লঙ্ঘনের ‘কোনো অজুহাত নেই।’

সোমবার ভোরে মার্কিন সামরিক বাহিনী এক্সে এক পোস্টে দাবি করে, তাদের হামলায় ইরানের সামরিক কমান্ড সেন্টার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র, সামুদ্রিক সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্ক লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। মার্কিন বাহিনীর দাবি, এই নতুন হামলার উদ্দেশ্য হলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের ওপর ইরানের হামলা চালানোর সক্ষমতাকে আরো দুর্বল করে দেয়া।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, এই ‘অত্যন্ত কঠোর’ হামলাগুলো সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নিহত তিন মার্কিন সেনাসদস্যের সম্মানে পরিচালিত হয়েছে। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আজ রাতে আমরা তাদের ওপর আবারো খুব কঠোরভাবে আঘাত হেনেছি এবং সেটা করেছি সম্ভবত তিনজন মহান দেশপ্রেমিকের সম্মানে।’

ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান ‘অত্যন্ত, অত্যন্ত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামরিকভাবে তারা প্রায় সবকিছুই হারিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘তাদের কাছে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র, কিছু ড্রোন এবং সামান্য উৎপাদন সক্ষমতা আছে, তবে খুব বেশি নয়।’ মার্কিন সেনাদের মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা গভীরভাবে দুঃখিত।’ তিনি যোগ করেন, নিহত সেনারা লড়াই করছিলেন যাতে তেহরান ‘পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে।’

শুক্রবার জর্দানে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় আরো দুই মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হন। সোমবার মার্কিন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেন, হাওয়াইয়ের ২৫ বছর বয়সী লেফটেন্যান্ট টাইলার জেমস ফিহান এবং টেক্সাসের ১৯ বছর বয়সী প্রাইভেট ইসাবেলা গনজালেস গত ১৭ জুলাই মুয়াফফাক শালতি বিমানঘাঁটিতে ‘শত্রুপক্ষের হামলায়’ নিহত হন। সেন্টকমের ঘোষণার কিছুক্ষণ পরই ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের বন্দর মাহশাহর, বন্দর ইমাম খোমেনি ও চাবাহার এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবরিজ শহর রয়েছে।

ইরানের আধা সরকারি মেহের নিউজ এজেন্সি জানায়, তাবরিজের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একজন নিহত এবং আরো কয়েকজন আহত হয়েছেন। পরে সোমবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, দক্ষিণাঞ্চলের বন্দরনগরী বুশেহরের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানো হয়েছে। শহরটিতেই ইরানের বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অবস্থিত।

বুশেহরের গভর্নর মোহাম্মদ মোজাফফারি বলেন, ‘কয়েক মিনিট আগে বুশেহর শহরের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন শত্রুর নিক্ষেপ করা প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে।’ তিনি জানান, হামলার পরিধি ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা তদন্ত করা হচ্ছে। এর আগে, গত রোববার দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নির্মাণাধীন দারখোভিন পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নিন্দা জানাতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তেহরান। ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা এই হামলাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

তেহরান এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্র জর্দান, কুয়েত ও সিরিয়ায় ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, জর্দানে তারা আকাবা বিমানবন্দরে অবস্থানরত মার্কিন সি-১৭ পরিবহন বিমান এবং একটি পি-৮ নজরদারি বিমান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে বিমানগুলোতে আঘাত হানা হয়েছে, যাতে বেশ কয়েকটি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ তারা আরো দাবি করে, মুয়াফফাক শালতি বিমানঘাঁটির ২০টি আশ্রয়কেন্দ্র, যেখানে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছিলেন, সেগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং এতে ডজন ডজন মার্কিন সন্ত্রাসী সেনা নিহত হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তারা নিউইয়র্ক টাইমসকে জানান, বিমানঘাঁটিতে হামলার আগে গত সপ্তাহে জর্দানে ইরানের তিনটি হামলায় আরো বহু মার্কিন সেনা আহত হন এবং হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কুয়েতে আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা আলি আল সালেম বিমানঘাঁটিতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা, বিমান চলাচল-সংক্রান্ত সরঞ্জামের গুদাম এবং এমকিউ-৯ ড্রোন রাখার হ্যাঙ্গার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যাতে কয়েকটি বিমান আগুনে পুড়ে যায়।

দুই সপ্তাহে প্রায় ১০০ মার্কিন সেনা আহত : পেন্টাগন

ইরানের সাথে যুদ্ধে গত দুই সপ্তাহে প্রায় ১০০ মার্কিন সেনা আহত হয়েছে বলে স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের সদরদফতর পেন্টাগন। সোমবার এক বিবৃতিতে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল এ তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছেন। তিনি জানান, গত ৭ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত আহত হওয়া এই সেনা সদস্যদের বেশিরভাগই মাথায় সামান্য আঘাত পেয়েছে এবং আহত সেনাদের ৯৬ শতাংশই ইতোমধ্যে নিজেদের দায়িত্বে ফিরে গেছে। ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকার একটি প্রতিবেদনের জবাবে শন পার্নেল এসব কথা বলেন। প্রতিবেদনে অভিযোগ করে বলা হয়েছিল যে, পেন্টাগন ইরানের হামলায় মার্কিন সেনা আহত হওয়ার খবর জনগণের কাছে লুকিয়ে রাখছে। তবে পার্নেল মার্কিন সেনা আহত হওয়ার তথ্য লুকিয়ে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

মার্কিন হামলায় নতিস্বীকার করবে না ইরান : সিআইএ

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত সামরিক আগ্রাসন সত্ত্বেও ইরান তাদের আলোচনার অবস্থান সহজ করবে না এবং এই বিমান হামলার ফলে তেহরানের ওপর বড় কোনো প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই বলে নতুন এক গোয়েন্দা তথ্য উঠে এসেছে। ওয়াশিংটন-তেহরান বর্তমানে শান্তিবস্থা ও যুদ্ধের মধ্যবর্তী এক অনিশ্চিত অচলাবস্থায় আটকে গেছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার বিশ্লেষকরা মনে করছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত ফেব্রুয়ারি মাসে যে সংঘাতের সূচনা করেছিলেন, বর্তমান কৌশলগত গতিপথ সেখানে এক মরণপণ অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে। দেশে এই যুদ্ধের জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও নতুন করে মার্কিন পদাতিক বা স্থলবাহিনী পাঠানোর ঝুঁকি নিলে রাজনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থ সঙ্কটে পেন্টাগন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দফতর পেন্টাগন ইরান যুদ্ধে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে ফেলায় তীব্র অর্থ সঙ্কটের মুখে পড়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধের এই ব্যয়ভার এতটাই প্রকট যে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তহবিল প্রায় শেষ হয়ে যেতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে সংঘাত বাড়ানোর পথে এগোচ্ছেন; কিন্তু পেন্টাগনের তহবিল সেই ধাক্কা সামলাতে পারছে না। ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সঙ্কটের কারণে পেন্টাগন ইতোমধ্যে সামরিক প্রস্তুতি ধরে রাখতে প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে খরচ সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে। ইরানের সাথে ভেস্তে যাওয়া যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। গত এক সপ্তাহের তীব্র লড়াইয়ে চার মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর ওয়াশিংটন আরো বড় সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে।