জমজম ও মোস্তফা : সুরের মেলবন্ধনে দুই ভাই-বোনের সঙ্গীতযাত্রা

Printed Edition
জমজম ও মোস্তফা : সুরের মেলবন্ধনে দুই ভাই-বোনের সঙ্গীতযাত্রা
জমজম ও মোস্তফা : সুরের মেলবন্ধনে দুই ভাই-বোনের সঙ্গীতযাত্রা

সাকিবুল হাসান

জমজম ও মোস্তফা কোহেজি সম্পর্কে প্রথম পরিচয় হলো তারা ভাই-বোন, আর দ্বিতীয়ত তারা একই ব্যান্ডের সহশিল্পী। পারিবারিক ঘনিষ্ঠতায় তাদের রসায়নটা একদম অন্যরকম। তারা আরবি ভাষায় খুনসুটি করেন, আবার চমৎকার সব ইংরেজি জোকস আর বাদ্যযন্ত্রের খুঁটিনাটি নিয়ে মেতে থাকেন। দু’জনের মধ্যে বড় জমজম অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় স্বতন্ত্রভাবে সঙ্গীতচর্চা শুরু করেন। নিজের নামেই বেশ কিছু গান প্রকাশের পর তিনি দেশে ফিরে আসেন। এরপর শুরু করেন ছোট ভাই মোস্তফার সাথে যৌথ কাজ। মোস্তফা বয়সে তার চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট এবং দীর্ঘ সময় ধরে নীরবে সুর সৃষ্টি ও নানা নিরীক্ষামূলক কাজ করে যাচ্ছিলেন।

তাদের ব্যান্ডের নামও ‘জমজম’। এখানে মোস্তফা সুরকার, প্রযোজক এবং লাইভ শো-তে ড্রামার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে জমজম মূল কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার ও গিটারিস্ট। তবে কাজের ক্ষেত্রে এই সীমারেখা প্রায়ই আবছা হয়ে যায়। মোস্তফা ‘আরব নিউজ’-কে বলেন, ‘আমরা মাত্র দু’জন মানুষ, তাই আমাদের অনেক ধরনের ভূমিকা পালন করতে হয়।’ তাদের রেকর্ড করা গানগুলোকে সাধারণত ‘সফট রক’ ঘরনায় ফেলা যায় যদিও কখনো তা বেশ কড়া, আবার কখনো খুব শান্ত ও কোমল। তবে তাদের লাইভ পারফরম্যান্সের আমেজ ও শক্তি একদম ভিন্ন মাত্রার হয়।

রিয়াদে শৈশব কাটানোর সময় থেকেই দুই ভাই-বোন সঙ্গীতচর্চা শুরু করেন। জমজম বলেন, ‘‘আমি খুব অল্প বয়সেই হাতে বাদ্যযন্ত্র তুলে নিয়েছিলাম। মনে আছে, বাবা-মা আমাকে একটা ‘বারবি’ কি-বোর্ড কিনে দিয়েছিলেন। সেখানে অক্ষরের মাধ্যমে গানের নোটগুলো শেখার ব্যবস্থা ছিল। ওটা সত্যিই দারুণ একটা খেলনা ছিল। সাথে ‘স্বরলিপি’ দেয়া ছিল, যা দেখে আমি ‘টুইঙ্কল টুইঙ্কল লিটল স্টার’ এবং ‘মেরি হ্যাড এ লিটল ল্যাম্ব’ বাজানো শিখেছিলাম।’’

মোস্তফাও সেই একই কি-বোর্ড ব্যবহার করতেন। তবে তার স্মৃতিতে একটি লাল খেলনা গিটার এবং পরবর্তী সময়ে একটি ‘স্পাইডার-ম্যান’ সিডি প্লেয়ারের কথা অমলিন হয়ে আছে। সিডি প্লেয়ারটি পাওয়ার প্রায় সাথে সাথেই তিনি ভেঙে ফেলেছিলেন। সেই দুঃখজনক ঘটনার কথা তিনি আজও ভুলতে পারেন না।

তাদের কারোরই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না, তবে বাড়িতে বা গাড়িতে সবসময়ই গানের আবহ থাকত। জমজম বলেন, ‘আমাদের বাবা-মায়ের গানের পছন্দ ছিল বৈচিত্র্যময়, যা আমাদের গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা রেখেছে।’ তাদের সঙ্গীত ভাবনায় পরিবর্তন আসে যখন তারা সপরিবারে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে চলে যান। সেখানে তাদের অনেক আত্মীয়স্বজন থাকতেন। তাদের চাচা বা মামারা গিটার বাজাতেন এবং কাজিনরা পিয়ানোতে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নেয়া ছিলেন। ফলে দাদির বাড়িতে সবাই মিলে যখন একত্রিত হতেন, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে গানের আসর জমে উঠত।

সঙ্গীতের ক্ষেত্রে তাদের বয়সের ব্যবধানটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। জমজমের বেড়ে ওঠা ছিল সিডি বা ডিজনির সাউন্ডট্র্যাক শুনে, যেখানে গানের কথার ওপর বেশি জোর দেয়া হতো। অন্যদিকে ২০০৩ সালে জন্ম নেয়া মোস্তফা একজন ‘ডিজিটাল নেটিভ’। রেডিওতে গান শোনার চেয়ে তিনি ইন্টারনেটে স্ক্রল করে নিজের পছন্দমতো শিল্পী খুঁজে নিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। জমজম যখন সমসাময়িক জনপ্রিয় গানগুলোতে পারদর্শী ছিলেন, মোস্তফা তখন নিজের আলাদা প্লে-লিস্ট তৈরি করতেন। মোস্তফার ভাষ্যমতে, ‘আমি টাইলার দ্য ক্রিয়েটর পছন্দ করতাম। আমার মনে হতো এটা আমি নিজেই খুঁজে পেয়েছি।’ গানের প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ফুটে ওঠে তাদের গান লেখার ধরনে। জমজমের কাছে গানের ‘কথা’ বা লিরিক সবার আগে। কিন্তু মোস্তফা কিছুটা শান্ত ও নিরীক্ষাধর্মী; তিনি বিশ্বাস করেন কেবল সুরের মূর্ছনাতেই সব আবেগ প্রকাশ করা সম্ভব। হাসতে হাসতে জমজম বলেন, ‘ও একবার বলেছিল যে, চমৎকার সুরের ওপর কেউ যদি কেবল ‘ডিম, ডিম, ডিম’ করেও গান গায়, মানুষ তা পছন্দ করবে। ওর এই যুক্তি আমার একদমই পছন্দ হয়নি।’ মোস্তফা কেবল মুচকি হাসলেন।