ক্ষেতলাল (জয়পুরহাট) সংবাদদাতা
মেঠোপথ, সবুজ ক্ষেত ও শান্ত জলাশয়ে ঘেরা জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার কানাইপুকুর গ্রাম। সারাদিন যে নিঝুম নীরবতা বজায় থাকে, সূর্য পাটে বসতেই বদলে যায় সেই চিত্র। গোধূলির আলোয় নীল দিগন্ত থেকে সাঁঝের মেঘের মতো ডানা মেলে উড়ে আসে হাজারো পরিযায়ী ও দেশী পাখি। কোনোটি আকাশে চক্কর কাটে, কোনোটি সরাসরি গিয়ে বসে চেনা গাছের ডালে। মুহূর্তের মধ্যে মণ্ডল বাড়ির চার পাশের মেহগনি, আমগাছ ও বাঁশঝাড়গুলো পরিণত হয় এক মুখরিত পাখির দ্বীপে। ডালে ডালে তখন ডানার আকুল ঝাপটানি আর অবিরাম কিচিরমিচির।
গ্রামের এই পাখি কলোনির নেপথ্যে রয়েছে মরহুম আলহাজ আব্দুস ছোবহান মণ্ডলের ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি। স্থানীয়দের হিসেবে, প্রতি মৌসুমে এখানে প্রায় ৫০ হাজার শামুকখোল আশ্রয় নেয়। পাশাপাশি শ্বেতশুভ্র বক, কানিবক, পানকৌড়ি ও শঙ্খচিলের মেলবন্ধনে চার পাশ সুরের মেলায় রূপ নেয়। ফলে কানাইপুকুর এখন আর কেবল একটি গ্রাম নয়, মানুষ আর প্রকৃতির অপূর্ব সহাবস্থানের এক উদাহরণ।
গাছের ডালে এই বিশাল পাখির রাজ্য কিন্তু এক দিনে গড়ে ওঠেনি। মণ্ডল পরিবার সূত্র জানায়, ২০০৭-০৮ সালের দিকে বর্ষার মুখে প্রথম দু’টি পথভোলা শামুকখোল আশ্রয় নেয় এ বাড়ির গাছে। বাড়ির লোকজন তাদের তাড়াননি। পরম মমতায় থাকতে দেয়ায় অবুঝ পাখিগুলো নিরাপদবোধ করে এবং বাচ্চা লালন-পালন শেষে ফিরে যায়। পরের বছর তারা আরো বড় দল নিয়ে ফিরে আসে। সেই থেকে প্রতি বছরই পাখির সংখ্যা এবং বাসার পরিধি বেড়েই চলেছে।
বর্তমানে এই অভয়ারণ্য পরম যতেœ আগলে রাখেন আব্দুস ছোবহান মণ্ডলের ছোট ছেলে জাহাঙ্গীর আলম মণ্ডল। তিনি বলেন, পাখিগুলো এখন আমাদের পরিবারের অংশ। আমরা নিশ্চিত করি কেউ যেন তাদের ক্ষতি না করে বা গাছে উঠে বিরক্ত না করে। দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীদেরও আমরা সে অনুরোধ করি।
প্রতি বছর এপ্রিলের শুরুর দিকে হাওয়ার টানে কানাইপুকুরে প্রথম ঝাঁক এসে পৌঁছায়। এপ্রিলের শেষ নাগাদ বাসা তৈরি ও ডিম পাড়ার কাজ চলে। মে ও জুনের প্রথমার্ধে ডিম ফুটে বের হয় কচি ছানা। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ছানারা উড়তে শেখে এবং পুরো গ্রাম তাদের কলতানে মুখর থাকে। নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত শীতের আমেজ শুরু হলে তারা সাময়িকভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু আবার বসন্ত ও কালবৈশাখীর মেঘ জমলেই নিজেদের পুরনো নীড়ে ফিরে আসে।
ক্ষেতলাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির মুন্সী কানাইপুকুরের এই পাখি কলোনিকে প্রকৃতির অনন্য সৃষ্টি আখ্যা দিয়ে বলেন, পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল রক্ষায় প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয়দের সচেতনতা প্রশংসনীয়। এই অভয়ারণ্য সংরক্ষণ ও দর্শনার্থীদের জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধনে সরকার সম্ভাব্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।



