- ১২ হাজার ৮৭৯ পরিবারের তথ্য নিয়ে বিবিএসের জরিপ
- দেশের মোট খাদ্য উৎপাদকের ৫৩.৬৫ শতাংশই ক্ষুদ্র কৃষক
- শ্রম-দিন প্রতি আয়েও ক্ষুদ্র ও বৃহৎ কৃষকের বড় ব্যবধান
- চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র কৃষক বেশি, সিলেটে বৃহৎ কৃষকের আধিক্য
বাংলাদেশের কৃষি এখনো ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদকদের ওপর নির্ভরশীল হলেও আয় ও উৎপাদনশীলতায় বৃহৎ উৎপাদকদের সাথে তাদের ব্যবধান উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে মোট খাদ্য উৎপাদকের ৫৩ দশমিক ৬৫ শতাংশই ক্ষুদ্র কৃষক। কিন্তু তাদের গড় বার্ষিক আয় মাত্র ৩৩ হাজার ৬৩৯ টাকা, যা বৃহৎ উৎপাদকদের গড় বার্ষিক আয় এক লাখ ২৯ হাজার ৯৫৬ টাকার প্রায় চার ভাগের এক ভাগ। একইভাবে শ্রম-দিন প্রতি ক্ষুদ্র কৃষকের গড় আয় এক হাজার ৪৯৪ টাকা, যেখানে বৃহৎ উৎপাদকদের আয় দুই হাজার ৩০১ টাকা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদকদের আয় ও উৎপাদনশীলতা বিষয়ক জরিপ ২০২৫’-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে।
টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) সূচক ২.৩.১ (শ্রম একক প্রতি উৎপাদন) এবং ২.৩.২ (ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদকদের গড় আয়)-এর জাতীয় ভিত্তিরেখা নির্ধারণের লক্ষ্যে পরিচালিত এ জরিপে দেশের আটটি বিভাগ এবং কৃষির পাঁচটি প্রধান খাত- অস্থায়ী ফসল, স্থায়ী ফসল, বনায়ন, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্যচাষ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ জন্য ১২ হাজার ৮৭৯টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদকের হার সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম বিভাগে, যেখানে ৫৯ দশমিক ৮১ শতাংশ উৎপাদক ক্ষুদ্র। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রংপুর, যেখানে এ হার ৫৯ দশমিক ২৯ শতাংশ। বিপরীতে সিলেটই একমাত্র বিভাগ, যেখানে বৃহৎ উৎপাদক সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং ক্ষুদ্র উৎপাদকের হার ৩৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণের চিত্রও উঠে এসেছে জরিপে। ক্ষুদ্র উৎপাদক পরিবারের মধ্যে মাত্র ১০ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার নারী-প্রধান। এ ছাড়া সব মিলিয়ে ৪৭ শতাংশ ক্ষুদ্র উৎপাদক পরিবারে নারীরা নেতৃত্বের ভূমিকায় রয়েছেন।
বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, সব ধরনের খাদ্য উৎপাদক বিবেচনায় শ্রম-দিন প্রতি জাতীয় গড় উৎপাদনশীলতা এক হাজার ৮৬৮ টাকা। ক্ষুদ্র উৎপাদকদের উৎপাদনশীলতা এ গড়ের নিচে থাকলেও বৃহৎ উৎপাদকরা জাতীয় গড়ের অনেক ওপরে অবস্থান করছেন। বিভাগভিত্তিক হিসাবে রাজশাহীতে ক্ষুদ্র উৎপাদকদের শ্রম-দিন প্রতি উৎপাদনশীলতা সর্বোচ্চ দুই হাজার ৯৩ টাকা। অন্যদিকে ময়মনসিংহে এ হার সর্বনিম্ন, এক হাজার ১৩৫ টাকা।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শ্রম-দিন প্রতি উৎপাদনশীলতায় শীর্ষে রয়েছে মৎস্য খাত, যেখানে উৎপাদনের মূল্য ১১ হাজার ৩৮২ টাকা। এরপর রয়েছে স্থায়ী ফসল ছয় হাজার ৫৩০ টাকা, বনজ খাত ৫ হাজার ৩৯০ টাকা, অস্থায়ী ফসল দুই হাজার ৫৮৫ টাকা এবং প্রাণিসম্পদ খাত এক হাজার ৪৫৯ টাকা। তবে স্থায়ী ফসল ও বনজ খাতে ক্ষুদ্র উৎপাদকরা বৃহৎ উৎপাদকদের থেকে বেশি উৎপাদনশীল। স্থায়ী ফসলে ক্ষুদ্র উৎপাদকদের শ্রম-দিন প্রতি উৎপাদন ৯ হাজার ১৮২ টাকা, যেখানে বৃহৎ উৎপাদকদের চার হাজার ৬০৩ টাকা। বনজ খাতেও ক্ষুদ্র উৎপাদকদের উৎপাদনশীলতা ছয় হাজার ৫১৮ টাকা, যা বৃহৎ উৎপাদকদের চার হাজার ৬৫৬ টাকার চেয়ে বেশি।
জরিপে আরো দেখা যায়, সব খাদ্য উৎপাদকের জাতীয় গড় বার্ষিক আয় ৭৮ হাজার ২৮৬ টাকা। কৃষির বিভিন্ন খাতের মধ্যে প্রাণিসম্পদ থেকে সর্বোচ্চ গড় বার্ষিক আয় আসে ৭০ হাজার ৪৩২ টাকা। ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদকদের ক্ষেত্রেও প্রাণিসম্পদই সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস। তারা এ খাত থেকে বছরে গড়ে ২৮ হাজার ৪২১ টাকা আয় করেন, যা তাদের মোট বার্ষিক আয়ের ৮৪ দশমিক ৫ শতাংশ। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ক্ষুদ্র উৎপাদকদের সর্বোচ্চ বার্ষিক আয় রাজশাহীতে ৪৪ হাজার ৭০৭ টাকা এবং সর্বনিম্ন সিলেটে ২৪ হাজার ৬৩৬ টাকা।
বিবিএস জানিয়েছে, এই জরিপের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো এসডিজির সংশ্লিষ্ট দু’টি সূচকের জন্য জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্বমূলক ভিত্তিরেখা তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে ক্ষুদ্র কৃষকের আয় ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কৃষি সহায়তা কর্মসূচির কার্যকারিতা মূল্যায়নে এ তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



