নয়া দিগন্ত ডেস্ক
চলমান সামরিক সঙ্ঘাত বন্ধ করে সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতা ও চাপ অব্যাহত রাখবে বলে ঘোষণা করেছে পাকিস্তান। আলজাজিরা জানায়, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র তাহির আনদাবি ইসলামাবাদে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন যে ‘যদিও সমঝোতা স্মারকটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বর্তমানে নানা ধরনের বড় চ্যালেঞ্জ ও জটিলতা দেখা দিয়েছে, তা সত্ত্বেও পাকিস্তান সব পক্ষকে অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ করার এবং আবার কারিগরি পর্যায়ের সংলাপে বসার জন্য তার জোরালো প্রচেষ্টা ও উৎসাহ জারি রাখবে’। শান্তি প্রক্রিয়াকে বাঁচিয়ে রাখতেই তাদের এই ধারাবাহিক চেষ্টা বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে একটি টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পাকিস্তান প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। গত এপ্রিলে পাকিস্তানে এক বিশেষ শান্তি সংলাপের আয়োজন করা হয়েছিল, যা ছিল বিগত চার দশকের দীর্ঘ ইতিহাসে প্রথম কোনো ঘটনা যেখানে মার্কিন এবং ইরানি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অংশ নিয়েছিলেন।
ইসলামাবাদের মধ্যস্থতার ফলেই গত জুন মাসে দুই দেশের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। পরবর্তীতে এই শান্তি প্রস্তাবটি বিশ্বনেতাদের অংশগ্রহণে সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক সম্মেলনেও বিস্তারিতভাবে পর্যালোচিত ও আলোচিত হয়েছিল।
উত্তেজনা আরো তীব্র, মার্কিন পঞ্চম নৌবহরে ইরানের হামলা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে বাহরাইনে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরে আবারো হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। একই সাথে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোনও ভূপাতিত করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার আইআরজিসির বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করেছে ইরানের আধাসরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম।
আইআরজিসির দাবি, ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আন্দিমেশক শহরের আকাশে একটি ‘শত্রুপক্ষের’ এমকিউ-৯ ড্রোন শনাক্ত করার পর সেটি গুলি করে ভূপাতিত করা হয়। তাদের ভাষ্য, মহাকাশ বাহিনীর অধীনে পরিচালিত নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ড্রোনটি ধ্বংস করা হয়েছে। এ দিকে ইরাকের কুর্দি বাহিনী জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট উত্তরাঞ্চলীয় কুর্দিস্তান অঞ্চলের রাজধানী এরবিলের আকাশে বিস্ফোরকবোঝাই আটটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়, এরবিলে মার্কিন দূতাবাসের কাছাকাছি এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং আকাশে ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধের অঙ্গীকার ইরানের
যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হস্তক্ষেপ শেষ পর্যন্ত প্রতিহত করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের সেনাবাহিনী। একই সাথে দেশটি জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের অবকাঠামোয় হামলার হুমকি বাস্তবায়ন করলে আরো বিস্তৃত ও ভয়াবহ জবাব দেয়া হবে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে। ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেন, আমরা নিঃসন্দেহে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যাবো এবং এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নিষ্ক্রিয় করে দেবো। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেয়ার একমাত্র উপায় হলো জুনে দু’পক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক মেনে চলা এবং প্রণালীতে জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত ইরানের বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন করা।
আকরামিনিয়া আরো বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ইরানের অবকাঠামোয় হামলার হুমকি কার্যকর করেন, তাহলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী পুরো অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অবশিষ্ট সব অবকাঠামোতে’ হামলা চালাবে। তিনি দাবি করেন, ইরানের জবাব আগের হামলাগুলোর চেয়ে আরো কঠোর, বিস্তৃত এবং ধ্বংসাত্মক হবে। ইরানের সেনাবাহিনী আরো জানিয়েছে, তারা কুয়েত ও জর্দানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
একই সাথে প্রতিবেশী দেশগুলোকেও সতর্ক করে ইরান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর সুযোগ দেয়া হলে তার জবাব দেয়া হবে। আকরামিনিয়া বলেন, আমাদের প্রতিবেশীদের জানা উচিত, যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি দেয়া এবং ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালানোর সুযোগ দেয়া গ্রহণযোগ্য নয়। এর জবাব অবশ্যই দেয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী সপ্তাহে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুর মতো বেসামরিক স্থাপনায় হামলা বাড়ানোর হুমকি দিয়েছেন। এরপরই ইরানের কেন্দ্রীয় সামরিক সদর দফতর খাতামুল আম্বিয়ার মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইব্রাহিম জোলফাকারি বলেন, ট্রাম্প যদি ইরানের অবকাঠামোতে হামলার হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তাহলে ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীর আঘাতেই পুরো অঞ্চলের সব অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি বলেন, কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ ইরানের একটি বড় রেড লাইন এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে দেয়া হবে না। তিনি আরো বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এবার আগের চেয়েও আরো তীব্র, ব্যাপক ও বিধ্বংসী আঘাত হানবে। ইব্রাহিম যুলফাগারি বলেন, ‘নির্বোধ শত্রুর জেনে রাখা উচিত, আমাদের জন্য এই মহাকাব্যিক মুহূর্তটি এড়িয়ে যাওয়ার মুহূর্ত নয়। ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলার জবাব সমান মাত্রায় হবে না, বরং আরো শক্তিশালী, বিস্তৃত ও ধ্বংসাত্মক হবে।’ তিনি বলেন, ‘যদি ফাঁপা ও অন্তঃসারশূন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের ইরানের অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার সাম্প্রতিক হুমকি কার্যকর করা হয়, তাহলে ইরানের সংযমের কারণে যা কিছু অবশিষ্ট আছে (উপসাগরীয় অঞ্চলের সব অবকাঠামো) তা ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীর আঘাতে এমনভাবে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে যে তার কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট থাকবে না। এমনকি মনে হবে, যেন এগুলোর কোনো অস্তিত্বই ছিল না। যুলফাগারি আরো সতর্ক করে বলেন, ‘অপরাধী আমেরিকা এই অঞ্চলে তার আইনশৃঙ্খলাহীনতা ও অস্থিতিশীলতা অব্যাহত রেখেছে। কোনো অবস্থাতেই ইরান একটি বিদেশী ও বহিঃআঞ্চলিক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে হরমুজ প্রণালীতে হস্তক্ষেপ করতে দেবে না।’
আলজাজিরা বলছে, সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় উপসাগরীয় দেশগুলো বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী, সামরিক প্রস্তুতি বৃদ্ধি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা আরো কঠোর করেছে। নিরাপত্তা জোরদার করা স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে তেল ও গ্যাস স্থাপনা, বিমানবন্দর এবং সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ (ডিস্যালিনেশন) প্ল্যান্ট।
এ দিকে বাহরাইন জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া বিপুলসংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। পাশাপাশি বৃহস্পতিবার উপসাগরীয় অঞ্চলের আরো কয়েকটি দেশও একই ধরনের হামলা প্রতিহত করার দাবি করেছে। তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী বা আরো বিস্তৃত সঙ্ঘাত শুরু হলে কোনো বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থাই দীর্ঘ সময় কার্যকরভাবে সব হামলা ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতি শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেই নয়, বিশ্ব অর্থনীতিকেও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এই কারণেই উপসাগরীয় দেশগুলো সঙ্ঘাতে জড়িত সব পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে এনে যুদ্ধের অবসান এবং কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।



