যুদ্ধবিরতি উপেক্ষা করে গাজায় রাতভর ইসরাইলি হামলা

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • গাজায় গণহত্যার পাশাপাশি পশ্চিমতীরে নতুন নাকবা
  • মার্চে গাজায় নতুন সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা ইসরাইলের

চলমান যুদ্ধবিরতি উপেক্ষা করে গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় রাতভর হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। এতে অন্তত তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরো সাতজন। চিকিৎসা সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে আলজাজিরা।

খবরে বলা হয়, রোববার ভোর পর্যন্ত চালানো এসব হামলার লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ গাজার রাফাহ ও খান ইউনুস, গাজা শহরের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেইতুন এলাকা এবং অবরুদ্ধ উপত্যকার আরো কয়েকটি বসতি। এক ঘটনায় খান ইউনুসে আহত এক ফিলিস্তিনিকে হাসপাতালে নেয়ার সময় ইসরাইলি একটি কোয়াডকপ্টার ড্রোন থেকে হামলা চালানো হয়, এতে ওই ব্যক্তি নিহত হন।

ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, জেইতুন এলাকার পূর্বাংশে ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে দুইজন ফিলিস্তিনি নিহত হন। একই সাথে গাজা শহরের তুফফাহ ও জেইতুন এলাকায় গোলাবর্ষণ করা হয় এবং পরে সামরিক যান

ওয়াফার তথ্যমতে, মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের পূর্বাঞ্চল এবং উত্তর গাজার জাবালিয়া ও বেইত লাহিয়া এলাকায় বিমান হামলা চালায় ইসরাইলি যুদ্ধবিমান। পাশাপাশি উত্তর গাজার উপকূলীয় এলাকাগুলোতেও ইসরাইলি নৌবাহিনী থেকে গোলাবর্ষণ করা হয়েছে। গাজা শহর থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক তারেক আবু আজ্জুম জানান, পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, গাজা শহরের কেন্দ্র ও পূর্বাঞ্চলে ইসরাইলি ড্রোনের শব্দ শোনা যাচ্ছে এবং যুদ্ধবিরতির জন্য নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়েও হামলা চালানো হচ্ছে। রাফাহ, খান ইউনুসের পূর্বাংশ এবং জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে ব্যাপকভাবে ভবন ধ্বংস করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ আলোচনায় চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গাজায় গণহত্যার পাশাপাশি পশ্চিমতীরে নতুন নাকবা

গাজায় চলমান গণহত্যার পাশাপাশি পশ্চিমতীরেও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে ইসরাইল। জেনিন, তুলকারেম ও নূর শামস শরণার্থী শিবির ধ্বংস করে পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, যা বিশ্লেষকদের মতে ‘নতুন নাকবা’র দিকে ঠেলে দিচ্ছে ফিলিস্তিনিদের। ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত ‘অপারেশন আয়রন ওয়াল’-এ প্রায় ৪০ হাজার শরণার্থীকে জোরপূর্বক তাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়। জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী সংস্থা জানায়, এটি ১৯৬৭ সালের পর সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুতি সঙ্কট। জেনিন শিবিরের ৪৩ শতাংশ, নূর শামসের ৩৫ শতাংশ এবং তুলকারেমের ১৪ শতাংশ এলাকা সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস হয়েছে। স্থানীয় নেতারা বলছেন, শিবির ধ্বংসের মাধ্যমে ইসরাইল শরণার্থী পরিচয় ও প্রত্যাবর্তনের অধিকার মুছে দিতে চাইছে, যা ফিলিস্তিনি অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করার অংশ।

ইসরাইলের বাধায় তীব্র শীতে মানবিক সঙ্কটে গাজা

তীব্র শীত ও ঝড়ো আবহাওয়ার মধ্যে গাজায় জরুরি মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইল। মোবাইল হোম, টেকসই আশ্রয়, তাঁবু মেরামতের সরঞ্জাম ও নির্মাণসামগ্রী ঢুকতে না দেওয়ায় হাজারো বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি পরিবার চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। অধিকাংশ মানুষ পাতলা ক্যানভাস ও প্লাস্টিকের তৈরি অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করায় প্রবল বাতাস ও বৃষ্টিতে সুরক্ষা পাচ্ছে না। গাজায় রাতের তাপমাত্রা নেমে এসেছে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। গাজার সিভিল ডিফেন্স সতর্ক করে বলেছে, প্রতিটি নিম্নচাপ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিচ্ছে। সংস্থাটির মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বলেন, এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং নির্মাণসামগ্রী প্রবেশে বাধা দেয়ার ফল। জাতিসঙ্ঘের হিসাবে, ইসরাইলের দুই বছরের বেশি সময়ের যুদ্ধে গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাজার পশ্চিমাঞ্চলে কাফারনা পরিবারসহ অসংখ্য পরিবার রাতভর ঝড়ে তাঁবু ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। বাবা-মা ও সন্তানরা পালাক্রমে খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে থেকেছে, তবুও তাঁবুতে পানি ঢুকেছে। শিশুদের মধ্যে ঠাণ্ডাজনিত অসুস্থতা ছড়িয়ে পড়ছে। পরিবারগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জরুরি ভিত্তিতে শক্ত তাঁবু ও ক্যারাভান পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছে।

শীতে জমে মারা গেল ২ মাসের ফিলিস্তিনি শিশু

চরম শীতের কারণে গাজায় আরো এক ফিলিস্তিনি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। দুই মাস বয়সী মোহাম্মদ আবু হারবিদ আল-রান্তিসি শিশু হাসপাতালে হাইপোথারমিয়ায় মারা যায় বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এতে ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত ঠাণ্ডায় মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা দাঁড়াল চারজন, আর ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে মোট ১২ জন। আল-আওদা হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে ইনকিউবেটরের ব্যাটারি না থাকায় ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় অপরিণত শিশুরা মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, ইসরাইলি বিধিনিষেধের কারণে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও শিশু খাদ্যও সংকটের মধ্যে রয়েছে।

হেবরনে ইসরাইলি গুলিতে ফিলিস্তিনি নিহত

অধিকৃত পশ্চিমতীরে সহিংসতা বাড়তে থাকায় হেবরনে ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে শাকের ফালাহ আল-জাবারি (৫৮) নিহত হয়েছেন। নিহতের লাশ জব্দ করা হয়েছে। ফলে রেড ক্রিসেন্টকে লাশটি উদ্ধার করতে দেয়া হয়নি। এ দিকে নাবলুসের পুরনো শহরে ইসরাইলি বাহিনী অভিযান চালিয়ে দুই ফিলিস্তিনিকে গ্রেফতার করেছে। পূর্ব জেরুসালেমে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলা চালিয়ে গুলি ও স্টান গ্রেনেড ছোড়া হয় এবং বরসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়।

বসতি সম্প্রসারণে ত্বরান্বিত হচ্ছে ফিলিস্তিনি উচ্ছেদ

জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার রিপোর্ট ইসরাইলের নীতিকে ‘বর্ণবৈষম্যমূলক’ আখ্যা দেয়ার পরপরই বিতর্কিত ই-১ বসতি প্রকল্পে তিন হাজার ৪০১টি আবাসন নির্মাণের টেন্ডার অনুমোদন দিয়েছে ইসরাইল। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পশ্চিমতীর কার্যত দ্বিখণ্ডিত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, বসতি সম্প্রসারণ ও বসতি স্থাপনকারীদের হুমকিতে বেদুইন সম্প্রদায়সহ বহু ফিলিস্তিনি পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমানে পশ্চিমতীরে পাঁচ লাখের বেশি ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করছে, যা আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ।

মার্চে গাজায় নতুন সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা ইসরাইলের

ইসরাইল আগামী মার্চ মাসে গাজায় নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছে দেশটির গণমাধ্যম। টাইমস অব ইসরাইলের এক খবরে বলা হয়, এই অভিযানের মাধ্যমে গাজার আরো বিস্তৃত এলাকা দখল এবং তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ পশ্চিম দিকে, উপকূলের আরো কাছে সরিয়ে নেয়ার লক্ষ্য নিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। খবরে উদ্ধৃত কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রক্রিয়া চললেও ইসরাইলি সামরিক বাহিনী নতুন আক্রমণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। এক আরব কূটনীতিকের বরাতে বলা হয়েছে, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণে ব্যর্থতার অজুহাত দেখিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির আওতায় ইসরাইলি বাহিনী ইয়েলো লাইনে পিছু হটে, যার ফলে তারা গাজার প্রায় ৫৩ শতাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। মার্চে পরিকল্পিত অভিযানের মূল লক্ষ্য গাজা সিটি এবং এর আশপাশের অঞ্চল, যেখানে ইসরাইল ইতোমধ্যে নিয়ন্ত্রিত এলাকার পরিধি আরো বাড়াতে চায় বলে খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ দিকে হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম জানিয়েছেন, গাজা উপত্যকার প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা সরকারি কাঠামো বিলুপ্ত করে একটি টেকনোক্র্যাট কমিটির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে সংগঠনটির ‘স্পষ্ট সিদ্ধান্ত’ রয়েছে। তবে হামাস অভিযোগ করেছে, ইসরাইল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে এবং যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে যাওয়ার পথ ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।

যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে গত তিন মাসে প্রায় এক হাজার ২০০টি হামলায় ইসরাইল ৪৩৯ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে বলে জানানো হয়েছে। এসব হামলার মধ্যে বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও ঘরবাড়ি ধ্বংসের ঘটনাও রয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহত হয়েছেন ৭১ হাজার ৪০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি, যাদের মধ্যে অন্তত ২০ হাজার শিশু রয়েছে- এমন তথ্য দিয়েছে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো হাজারো মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী সংস্থা সতর্ক করেছে, টানা ঝড়, বন্যা ও আশ্রয় ধসে পড়ায় গাজায় মানবিক পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। একই সাথে সীমান্ত বন্ধ রেখে ও ত্রাণ প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ জোরালো হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠন ও আরব-ইউরোপীয় দেশগুলো গাজায় ‘নিরবচ্ছিন্ন ও টেকসই’ মানবিক সহায়তা প্রবেশের দাবি জানিয়েছে। চিকিৎসাসেবা সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, ত্রাণ কার্যক্রম বন্ধ হলে শত সহস্র ফিলিস্তিনি জীবনরক্ষাকারী সেবা থেকে বঞ্চিত হবে।