জাহাঙ্গীর আলম হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ)
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে ভয়াবহ নাব্যতা সঙ্কটে স্রোতহীন মরা খালে পরিণত হয়েছে এককালের প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র নদ। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে কৃষি সেচসহ জীববৈচিত্র্য। স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক বছর আগে এ নদটি খনন করা হলেও তা জনসাধারণের কোনো কাজেই আসেনি।
সরেজমিন হোসেনপুর-গফরগাঁও সড়কের ওপর নির্মিত খুরশিদ মহল সেতু সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভয়াবহ নাব্যতা সঙ্কটের কারণে নদের স্বাভাবিক অস্তিত্ব হারিয়ে খুরশিদ মহল সেতুর পাটাতন ভেসে উঠেছে। বইছে খালের মতো পানির প্রবাহ। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত অর্ধশত বছরের বেশি সময়ে ব্রহ্মপুত্র নদের তলদেশে পলি জমে দিন দিন এর নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে। পরিণত হয়েছে গতিহীন মরা খালে। ফলে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এ এলাকার জীববৈচিত্র্যসহ মৎস্যসম্পদ ও নানা জলজ প্রাণী। নেতিবাচক প্রভাবে হাজারো জেলে পরিবার এ পেশা ছেড়ে বেকারত্ব ঘোচাতে বেছে নিয়েছে অন্য পেশা। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা শাখা নদীগুলো এখন বিত্তবানদের ফসলি জমি।
স্থানীয় খুরশিদ মহল গ্রামের খাইরুল ঢালী, আব্দুল ওয়াদুদসহ অনেকেই আক্ষেপ করে বলেন, এক সময়ের উত্তাল ব্রহ্মপুত্র নদ আজ স্মৃতির অতলে হারিয়ে যাচ্ছে। নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় সেচনির্ভর অনেক কৃষকের পড়তে হচ্ছে সেচ সঙ্কটে। তাই পুনরায় ওই নদটি ফের ড্রেজিং করে এর পানির প্রবাহ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি নদের দুই পাড়ের মানুষের। এতে বাঁচবে কৃষক, চাঙ্গা হবে গ্রামীণ অর্থনীতিও।
জানা যায়, গত কয়েক বছর আগে ব্রহ্মপুত্র নদটি খননের পরেও বর্তমানে পানির প্রবাহ না থাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের তলদেশের বিভিন্ন স্থানে চলছে চাষাবাদ। এ সুযোগে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের লোকজন সিন্ডিকেট তৈরি করে কোটি টাকার বালু ও মাটির বাণিজ্য করে রাতারাতি ধনী বনে যাচ্ছেন। ফলে এক দিকে যেমন সরকার হারাচ্ছে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব, অন্য দিকে হুমকির মুখে পড়েছে এলাকার ছোট-বড় ব্রিজ ও কালভার্ট। সাধারণত শুকনো মওসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল দখলে নিতে প্রতি মওসুমেই একাধিক গ্রুপের মধ্যে সৃষ্ট সংঘর্ষ ও দাঙ্গা হাঙ্গামায় হতাহতের ঘটনা ঘটার নজির রয়েছে।
ফলে ব্রহ্মপুত্রের খাস জমি ও বালু ব্যবসার আধিপত্যকে কেন্দ্র করে নদী পাড়ের মানুষের মধ্যে সামাজিক অসন্তোষ দিন দিন বেড়েই চলেছে। হোসেনপুরের চর এলাকার বাসিন্দারা জানান, নাব্যতা সঙ্কটের কারণে শুকনো মওসুমে ছোট ছোট নৌকা চলতেও সমস্যার সৃষ্টি হয় হয়। ফলে ব্যবসা বাণিজ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করেন স্থানীয় অধিবাসীরা।
জনশ্রুতি রয়েছে, এককালে ওই প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ি দিয়ে তৎকালীন মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহের আমলে বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ বিশাল নৌবহর নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ি দিয়ে পরগনার প্রজা সাধারণের সুখ-দুঃখ স্বচক্ষে দেখার জন্য হোসেনপুর উপজেলার সিদলা এলাকায় আসতেন। পাশাপাশি হোসেনপুর উপজেলার চৌদার গ্রামের ‘নীল কুঠিতে’ অবকাশ যাপন করে নিজ রাজ্যে ফিরেও যেতেন একই পথে। এ সব কিছুই এখন স্মৃতির গহীনে হারিয়ে গেছে বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।


