ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি হামলা

Printed Edition
বাহরাইনের মানামায় মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা ক্ষেপনাস্ত্র হামলা : আলজাজিরা
বাহরাইনের মানামায় মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা ক্ষেপনাস্ত্র হামলা : আলজাজিরা

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • ইসরাইলসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েক দেশের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা আক্রমণ
  • ইরানে মেয়েদের স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত অন্তত ৮০
  • শত্রুরা পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত হামলার হুঁশিয়ারি আইআরজিসির
  • হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন বন্ধ

কয়েক সপ্তাহের উত্তেজনা আর হুমকির পর অবশেষে ইরানে যৌথভাবে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। ঘটনার পর গতকাল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বড় ধরনের যুদ্ধের অভিযান’ শুরু হয়েছে। এর আগে, গতকাল শনিবার ভোরে ইরানের রাজধানী তেহরান ও অন্যান্য কয়েকটি বড় শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র ইসরাইল।

এ দিকে যৌথ হামলার জবাবে ইসরাইলসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েক দেশে মার্কিন স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে তেহরান। বাহরাইন, কাতার, কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর দিয়েছে সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা। অন্তত হাফ ডজন আরব দেশে তেহরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী স্বীকার করেছে যে ইরানের দিক থেকে তাদের দেশে ঝাঁকে ঝাঁকে মিসাইল আক্রমণ চালানো হয়।

সকালে দক্ষিণ ইরানে মেয়েদের একটি স্কুলে ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ৮০ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে। দেশটির মিনাব কাউন্টির গভর্নর বলেছেন, সকালে একটি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে আরো অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী। এছাড়া আরো একটি স্কুলেও হামলা চালানো হয়।

ইরানের ৩১ প্রদেশের ২০টিতেই হামলা : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২০টিরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এই তথ্য জানিয়েছে। সোসাইটির মুখপাত্র মোজতবা খালেদি বলেছেন, ‘এখন পর্যন্ত ২০টিরও বেশি প্রদেশ হামলার শিকার হয়েছে’। রাতে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত দুইশতাধিক ইরানী নিহত এবং ৮ শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানে ইসরাইলি ও মার্কিন হামলার সাথে জড়িত সব স্থাপনা এখন ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্রবাহিনীর ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে’ পরিণত হবে। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে তিনি বলেছেন, ইরানের সশস্ত্রবাহিনী সেসব স্থানকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করছে, যেখান থেকে মার্কিন ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের অভিযান পরিচালিত হয়েছে। একই সাথে ইরানের প্রতিরক্ষা কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত সব স্থাপনাও আমাদের লক্ষ্যবস্তুর অন্তর্ভুক্ত।

ইসরাইলে ফের ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়ল ইরান : হামলার জবাবে দখলদার ইসরাইলকে লক্ষ্য করে ফের ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়েছে ইরান। টানা কয়েক দফা হামলার পর বাংলাদেশ সময় শনিবার বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে আবারো মিসাইল ছোড়ে ইরানি বাহিনী। ইসরাইলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরান কিছুক্ষণ আগে আরেক দফা মিসাইল ছুড়েছে। এসব মিসাইল প্রতিহত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে তারা। সংবাদ মাধ্যমে রাতের খবরে জানা গেছে, তেহরান ইসরাইলের বিভিন্ন অঞ্চলে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।

শত্রুরা পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত হামলার হুঁশিয়ারি আইআরজিসির : ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ইরানের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। শত্রু চূড়ান্তভাবে পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে।

বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, মার্কিন দূতাবাস বন্ধ : গত কয়েক মাস ধরে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চলা ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি সঙ্ঘাতে রূপ নিলো। শনিবারের এই বড় ধরনের হামলার পর ইরান বলেছে, তারা হামলার কঠোর জবাব দেবে। এর অংশ হিসেবে বাহরাইনের রাজধানী মানায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দফতরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর দেশটিতে দূতাবাস বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে তেহরানের ব্যাপক পাল্টা হামলা শুরু করার পর ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে বাহরাইনে নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস বলেছে, বাহরাইনের বিরুদ্ধে চলমান ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিপ্রেক্ষিতে রোববার বাহরাইনে মার্কিন দূতাবাস বন্ধ থাকবে।

এবার মধ্য ইসরাইলে সরাসরি আঘাত হেনেছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র : মধ্য ইসরাইলের দু’টি এলাকায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আঘাত হেনেছে। সেখানে জরুরি উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

সকালের পর থেকে ইরান থেকে ইসরাইলি ভূখণ্ডের দিকে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। উপকূলীয় এলাকা তেল আবিব ও হাইফা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে। এসব এলাকায় বারবার সাইরেন বাজানো হয়েছে এবং সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

কাতারের বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ: ইরানের ফারস নিউজ বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানী সশস্ত্রবাহিনী। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ কুয়েতের আল-সালেম বিমানঘাঁটি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা বিমানঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র।

মিসাইল হামলায় আবুধাবিতে একজন নিহত : যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরাইলের হামলার জবাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতেও পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান। তাদের এ মিসাইল হামলায় আমিরাতের আবুধাবিতে একজন নিহত হয়েছেন। দেশটি এক বিবৃতিতে বলেছে, তাদের এখানে হামলা চালিয়ে ইরান আন্তর্জাতিক আইন ও তাদের ভৌগলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘন করেছে। যেটির উপযুক্ত জবাব দেয়া হবে।

আরব আমিরাতের সবচেয়ে জনবহুল শহর দুবাইয়ে অন্তত তিনটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আরব আমিরাত ইরান থেকে ছোড়া নতুন এক ঝাঁক ক্ষেপণাস্ত্র বাধা দিয়ে ধ্বংস করেছে। দুবাইতে থাকা রয়টার্সের সহকর্মীরা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের ধাক্কায় তাদের ঘরের জানালাগুলো কেঁপে উঠেছিল।

অন্য দিকে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। বার্তাসংস্থা এএফপির করসপনডেন্ট জানিয়েছেন, রিয়াদে দু’টি বড় বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছে তিনি। এ ছাড়া আরো ছোট ছোট বিস্ফোরণের শব্দও তার কানে এসেছে।

কয়েক মাস ছক কষেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল : ইরানের ওপর পরিচালিত এই বিধ্বংসী হামলার নেপথ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে দীর্ঘ কয়েক মাসের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং যৌথ পরিকল্পনা ছিল বলে নিশ্চিত করেছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি এই সমন্বয় ও প্রস্তুতির কারণেই ইরানের ওপর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এবং সম্পূর্ণ সুসংগঠিত উপায়ে এই ব্যাপক হামলা চালানো সম্ভব হয়েছে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো ইরানি শাসনের সামরিক শক্তিকে ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা এবং ইসরাইলের জন্য তৈরি হওয়া যেকোনো অস্তিত্ব সঙ্কটের হুমকি চিরতরে নির্মূল করা।

সিএনএনের জানায়, ইসরাইলের প্রথম পর্যায়ের লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং সেগুলো উৎক্ষেপণের সরঞ্জাম। বর্তমানে তেহরানে অবস্থিত ইরানের গোয়েন্দা সদর দফতরের দিক থেকে ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন স্থগিত : ইরানে হামলার পর উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে তেহরানের পাল্টা হামলার পর হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল সরবরাহ স্থগিত করেছে কিছু শীর্ষ জ্বালানি কোম্পানি। গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যিক কোম্পানির এক শীর্ষ নির্বাহী রয়টার্সকে বলেছেন, “আমাদের জাহাজগুলো কয়েক দিন অপেক্ষা করবে।”

আরব উপদ্বীপ ও ইরানের মধ্যবর্তী এই প্রধান জলপথটি দিয়ে প্রায় দুই কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পরিবাহিত হয়। এই জলপথটি দিয়ে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ বড় ধরনের বিঘেœর হুমকির মুখে পড়বে।

ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও আইআরজিসি কমান্ডার নিহত : ইরানে ইসরাইলের হামলায় দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কামান্ডার নিহত হয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে রয়টার্স। তিনটি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থাটি।

ইসরাইলের অভিযানের সাথে দু’টি ও আঞ্চলিক একটি সূত্র রয়টার্সকে জানায়, ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহ ও আইআরজিসি কামান্ডার মোহাম্মদ পাকপৌর তেল আবিবের হামলায় নিহত হয়েছেন।

ইরানে হামলা ‘অবৈধ ও অসাংবিধানিক’, বললেন মার্কিন সিনেটর

মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড জে মার্কি ইরানে ট্রাম্পের সামরিক হামলাকে ‘অবৈধ ও অসাংবিধানিক’ বলে অভিহিত করেছেন। এক বিবৃতিতে মার্কি বলেন, এই হামলা কংগ্রেস অনুমোদিত নয়। এটি সব আমেরিকানদের জন্য বিপদ বয়ে আনবে। তিনি আরো বলেন, ট্রাম্পের অবৈধ কর্মকাণ্ড একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে, যা ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সেনা ও বেসামরিক নাগরিকদের জন্য মারাত্মক হুমকি।

হামলা বন্ধের আহ্বান রাশিয়ার : ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে রাশিয়া। চলমান সঙ্ঘাত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের পথে ফিরিয়ে আনার কথা বলছে দেশটি। এই হামলাকে ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন’ বর্ণনা করে এক বিবৃতিতে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত দ্রুত একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়ন দেয়া। এ হামলা অঞ্চলকে আরো অস্থিতিশীল করার ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

এ দিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র দিমিত্রি মেদভেদেভ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কড়া সমালোচনা করেছেন। এই সামরিক অভিযানকে আড়াল করার কৌশল হিসেবে ওয়াশিংটন পরমাণু আলোচনাকে ব্যবহার করেছে বলেও অভিযোগ তার।

“শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী আরো একবার তার আসল চেহারা দেখিয়ে দিলো। ইরানের সাথে সব আলোচনাই ছিল ঢাল। কারো সন্দেহ ছিল না। কারোই কোনো কিছুতে রাজি হওয়া দরকার ছিল না,” টেলিগ্রামে দেয়া পোস্টে মেদভেদেভ এসব বলেছেন বলে জানিয়েছে আলজাজিরা।