মো: সাজ্জাতুল ইসলাম ময়মনসিংহ
- ৫ কোটি টাকার পানি প্রকল্প অকার্যকর
- ৮ কোটি টাকার বক্সকালভার্টে বাড়ছে জলাবদ্ধতা
শতবর্ষে পদার্পণ করা ময়মনসিংহের প্রথম শ্রেণীর গৌরীপুর পৌরসভায় গত এক যুগে প্রায় ৬০৩ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট প্রস্তাব করা হলেও নাগরিক সেবায় দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত একাধিক প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন পৌরবাসিরা। তাদের অভিযোগ, পানি সরবরাহ প্রকল্প চালু হয়নি, খাল দখল করে নির্মিত বক্সকালভার্টে বেড়েছে জলাবদ্ধতা, আর বাজার উন্নয়নের নামে ব্যয় করা সরকারি অর্থও প্রত্যাশিত সুফল আনতে পারেনি।
পৌরসভার বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ১২ বছরে উন্নয়ন খাতে মোট প্রায় ৬০৩ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করা হয়। তবে বাস্তবে পৌরবাসী এখনো জলাবদ্ধতা, ভাঙাচোরা সড়ক, অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, অপরিকল্পিত বাজার এবং মৌলিক নাগরিক সেবার সঙ্কটেই পড়ে আছেন। বিপুল বাজেটের সাথে বাস্তব উন্নয়নের সামঞ্জস্য খুঁজে পাচ্ছেন না পৌরবাসিরা।
১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই পৌরসভায় দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত নগরায়ন, ড্রেনেজ সঙ্কট, খালের নকশা পরিবর্তন, শিশু পার্ক ও উন্মুক্ত বিনোদনস্থলের অভাব, কমিউনিটি সেন্টার না থাকা এবং অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, করের পরিমাণ বাড়লেও নাগরিক সেবার মান বাড়েনি। বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলেও এ বিষয়ে কার্যকর কোনো তদন্ত হয়নি বলেও অভিযোগ তাদের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পৌরসভার পানি সরবরাহ প্রকল্পের প্রথম ধাপে ব্যয় করা হয় দুই কোটি সাত লাখ ১৩ হাজার ৫৯০ টাকা এবং দ্বিতীয় ধাপে দুই কোটি ৮৬ লাখ সাত হাজার ৯২০ টাকা। এই দুই ধাপে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ের পাশাপাশি প্রতি বছর পাম্পচালকের বেতন বাবদ প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত পৌরবাসী এই প্রকল্পের আওতায় পানি সরবরাহ সুবিধা পাচ্ছেন না। ফলে প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
অন্য দিকে নতুনবাজার সিনেমা হল সড়ক, স্টেশন রোড ও বালুয়াপাড়া এলাকায় প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয়ে খালের ওপর বক্সকালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এতে খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং সতিষা, নওয়াগাঁও, গুজিখাঁ, নয়াপাড়া, পূর্ব দাপুনিয়া ও সাতুতীসহ অন্তত ১৫-১৬টি গ্রামের পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।
বাজার উন্নয়নের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন রয়েছে। প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সেড অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙে ফেলা হয়। পরে একই স্থানে প্রাণিসম্পদ বিভাগের উদ্যোগে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন মার্কেট নির্মাণ করা হলেও সেটি এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি।
২০১৩ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগের সহায়তায় গৌরীপুর পৌরসভার জন্য ৩০ বছরের একটি মাস্টারপ্ল্যান অনুমোদন করা হয়। তবে সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন সম্পর্কে অধিকাংশ নাগরিকই অবগত নন। বরং ধানমহাল-পাছেরকান্দা, মধ্যবাজার-কোনাপাড়া, কালিপুর মধ্যম তরফ-কলাবাগান সড়কসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বড় বড় গর্তে ভরে গেছে। বালুয়া নদীর ওপর নির্মিত বেইলি সেতুসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অনেক প্রকল্প এলাকায় তথ্যফলক না থাকায় ব্যয় ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত তথ্যও সাধারণ মানুষের অজানাই রয়ে গেছে।
এ বিষয়ে গৌরীপুর পৌর প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুনন্দা সরকার প্রমা বলেন, গত অর্থবছরে প্রস্তাবিত ও প্রকৃত বাজেটের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য ছিল। তাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রস্তুত করা হয়েছে, যার আকার ১৭ কোটি ৮৬ লাখ ৯ হাজার ৩৬৫ টাকা।
তবে বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় প্রতি অর্থবছরেই প্রস্তাবিত ও প্রকৃত বাজেটের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক থেকে যায়। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হওয়া অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ, বিতর্কিত প্রকল্পগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার ব্যবস্থা রাখা হোক।



