সাক্ষাৎকার : সাজ্জাদ হোসেন

স্বাধীন তদন্তহীন মানবাধিকার বিল ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’

যে বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন বা গুমের অভিযোগ উঠবে, সেই বাহিনী কিংবা অন্য কোনো প্রচলিত বাহিনীকে দিয়ে তদন্ত করালে নিরপেক্ষ ও সঠিক প্রতিবেদন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। এ কারণে বিলটি যতই ইতিবাচক ধারার কথা বলুক, মূল জায়গায় স্বাধীনতা না থাকলে পুরো বিষয়টি অনেকটা শুভঙ্করের ফাঁকিতে পরিণত হতে পারে।

আলমগীর কবির
Printed Edition

জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’-কে বাস্তবতাহীন ও ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সদস্য ও বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী সাজ্জাদ হোসেন। তার মতে, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত বাহিনী কিংবা অন্য কোনো প্রচলিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে তদন্ত করালে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা কম। গুমের মতো স্পর্শকাতর অভিযোগ তদন্তের জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কাঠামো প্রয়োজন। নতুন বিলের বিভিন্ন দিক নিয়ে নয়া দিগন্তের সাথে কথা বলেছেন তিনি। তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত-

প্রশ্ন : জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬-কে আপনি ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ বলছেন কেন?

সাজ্জাদ হোসেন : এই বিলের মধ্যে কিছু ইতিবাচক বিষয় রয়েছে। কিন্তু মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়নি। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা ও শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে যে কাঠামো রাখা হয়েছে, তাতে স্বাধীন তদন্ত কতটা সম্ভব হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

যে বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন বা গুমের অভিযোগ উঠবে, সেই বাহিনী কিংবা অন্য কোনো প্রচলিত বাহিনীকে দিয়ে তদন্ত করালে নিরপেক্ষ ও সঠিক প্রতিবেদন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। এ কারণে বিলটি যতই ইতিবাচক ধারার কথা বলুক, মূল জায়গায় স্বাধীনতা না থাকলে পুরো বিষয়টি অনেকটা শুভঙ্করের ফাঁকিতে পরিণত হতে পারে।

প্রশ্ন : আপনি বলছেন, প্রচলিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে গুমের তদন্ত করা সম্ভব নয়। কেন?

সাজ্জাদ হোসেন : ধরুন, র‌্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল। এখন পুলিশকে দিয়ে যদি সেই অভিযোগ তদন্ত করানো হয়, তাহলে ঘুরেফিরে একই ধরনের কাঠামোর মধ্যে তদন্ত হবে। আবার পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলে অন্য কোনো বাহিনী তদন্ত করবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- সেই বাহিনীগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক কী এবং তাদের ওপর কতটা প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা রয়েছে?

আরেকটি বাস্তবতা হলো, গুম করার সময় কেউ পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে বলে না যে ‘আমি অমুক বাহিনীর সদস্য’। অনেক ক্ষেত্রে তারা শুধু বলে, ‘আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক।’ ফলে ঘটনার প্রকৃত তথ্য বের করতে হলে স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ, কমান্ড চেইন অনুসন্ধান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রমাণ বিশ্লেষণের ক্ষমতা থাকতে হবে।

প্রশ্ন : তাহলে গুমের অভিযোগ তদন্তে আপনার প্রস্তাব কী?

সাজ্জাদ হোসেন : সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি তদন্ত কাঠামো থাকতে হবে। পুলিশের সহায়তা প্রয়োজন হলে পুলিশ থাকবে, কিন্তু তদন্তের নিয়ন্ত্রণ পুলিশের হাতে থাকতে পারে না। আমাদের দাবি হচ্ছে, গুমের তদন্তে পুলিশের সহায়তায় একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ইউনিট থাকতে হবে এবং এর সার্বিক মনিটরিং থাকতে হবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হাতে।

তদন্তকারী ইউনিটের ওপর রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা বাহিনীগত চাপ যেন না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ গুমের অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু ঘটনাটি ঘটেছে কি না, তা নয়- কে নির্দেশ দিয়েছে, কোথায় রাখা হয়েছিল, কারা অপারেশনে ছিল এবং পরে কী ঘটেছে- এসব বিষয়ও অনুসন্ধান করতে হবে।

প্রশ্ন : নতুন বিলে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে অভিযোগকারীর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। আপনি এটিকে কীভাবে দেখছেন?

সাজ্জাদ হোসেন : এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিলে বলা হয়েছে, কেউ গুমের অভিযোগ করার পর সেটি সত্য প্রমাণিত না হলে অভিযোগকারীকে পাঁচ বছরের সাজা দেয়া হতে পারে। বাস্তব পরিস্থিতিতে এটি ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের জন্য ভয় তৈরি করবে।

যে ব্যক্তি ইতোমধ্যে জীবনের ঝুঁকিতে আছেন, তিনি যদি জানেন যে তার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত না হলে উল্টো তাকেই কারাগারে যেতে হতে পারে, তাহলে তিনি থানায় গিয়ে অভিযোগ করার সাহস পাবেন কেন?

গুমের মতো ঘটনায় অনেক সময় প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া কঠিন। পরিবার জানে একজন মানুষকে তুলে নেয়া হয়েছে, কিন্তু কে তুলে নিয়েছে বা কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে- তা তারা জানে না। তাই অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া এবং মিথ্যা অভিযোগ করার মধ্যে পার্থক্য রাখতে হবে।

প্রশ্ন : বিলটি সংসদে দ্রুত পাস করার প্রক্রিয়া নিয়েও আপত্তি রয়েছে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

সাজ্জাদ হোসেন : এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি আইন। অথচ বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংসদীয় কমিটিকে মাত্র দুই কার্যদিবস সময় দেয়া হয়েছে। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি খসড়া দুই দিনে যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা সম্ভব নয়।

আমাদের আশঙ্কা হচ্ছে, আগামী সোম বা মঙ্গলবার যেভাবে বিলটি উত্থাপিত হয়েছে, সেভাবেই পাস হয়ে যেতে পারে। অথচ এর সাথে হাজার হাজার মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত।

প্রশ্ন : গুম কমিশনের অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

সাজ্জাদ হোসেন : অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠিত গুম কমিশনের কাজ থেকে আমরা দেখেছি, গুমের ঘটনা অনুসন্ধান কতটা জটিল। অনেক পরিবার বছরের পর বছর তাদের স্বজনের কোনো সন্ধান পায়নি। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, এখনো গুম হওয়া প্রায় সাড়ে ৩০০ ভিকটিম ফেরত আসেননি।

এই মানুষগুলোর পরিবার আজও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। নতুন আইন যদি স্বাধীন তদন্তের নিশ্চয়তা না দেয়, তাহলে এসব পরিবারের মনে চিরস্থায়ী শঙ্কা তৈরি হবে।

প্রশ্ন : নতুন বিলে তো কিছু ইতিবাচক ধারাও রয়েছে। সেগুলোকে কীভাবে দেখছেন?

সাজ্জাদ হোসেন : অবশ্যই ইতিবাচক কিছু বিষয় আছে। সাধারণ অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশনের প্রশাসনিক ও কার্যনির্বাহী ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। কমিশনের তদন্ত কর্মকর্তাকে ফৌজদারি কার্যবিধির অধীন তদন্ত কর্মকর্তার সমপর্যায়ের ক্ষমতা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযুক্তকে গ্রেফতারের সুযোগও রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া কারাগার, থানা বা সেফ হোমে আগাম ঘোষণা ছাড়াই পরিদর্শনের জন্য ‘জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা ইউনিট’ গঠন, ভুক্তভোগীকে দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণ এবং তথ্য প্রকাশকারীর সুরক্ষার মতো বিষয়ও ইতিবাচক।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশনের স্বাধীনতা কোথায়?

প্রশ্ন : এই জায়গাতেই মূল সমস্যাটি দেখছেন?

সাজ্জাদ হোসেন : অবশ্যই। বিলে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাকে ‘শৃঙ্খলা-বাহিনী’র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে কমিশনকে আগে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর নিজস্ব প্রতিবেদন ও পদক্ষেপের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

এটি স্বাধীন তদন্তের ধারণার সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটি অবশ্যই প্রশ্নের বিষয়। কারণ অভিযোগের বিষয় যদি হয় কোনো বাহিনীর সদস্য বা কাঠামোর বিরুদ্ধে, তাহলে প্রথম ধাপে সেই বাহিনীর নিজস্ব তদন্তের ওপর নির্ভরশীলতা কমিশনের স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে।

প্রশ্ন : কমিশনের নিয়োগ কাঠামো নিয়েও আপত্তি রয়েছে। আপনার মত কী?

সাজ্জাদ হোসেন : মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা শুধু আইনের ধারায় থাকলেই হবে না; নিয়োগ কাঠামোতেও সেটি নিশ্চিত করতে হবে। চেয়ারপারসন ও চার কমিশনার নির্বাচনের জন্য ৯ সদস্যের বাছাই কমিটির প্রধান করা হয়েছে স্পিকারকে। সেখানে দুই মন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ সরকারের প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্য।

ফলে প্রশ্ন হচ্ছে, এই কাঠামো কতটা স্বাধীন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকবে। মানবাধিকার কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকাংশেই নির্ভর করে কারা কমিশনে আসছেন এবং তাদের নিয়োগ কতটা স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হচ্ছে তার ওপর।

প্রশ্ন : তদন্ত দলের সদস্যদের ক্ষেত্রেও কি একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে?

সাজ্জাদ হোসেন : হ্যাঁ। তদন্ত দলের ৩০ শতাংশ সদস্য সরকারি প্রশাসন থেকে প্রেষণে নেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। আবার আর্থিক বরাদ্দের ক্ষেত্রেও সরকারের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। একটি স্বাধীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের কার্যকর স্বাধীনতার জন্য জনবল ও অর্থ-দু’টির ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন প্রয়োজন।

প্রশ্ন : আইনমন্ত্রী বলেছেন, মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত ক্ষমতা খর্ব করা হবে না। তারপরও আপনারা আপত্তি করছেন কেন?

সাজ্জাদ হোসেন : বক্তব্য আর আইনের বাস্তব কাঠামো এক বিষয় নয়। আইনমন্ত্রী নয়া দিগন্তকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে কমিশনের তদন্ত ক্ষমতা খর্ব করা হবে না। কিন্তু সংসদে উত্থাপিত বিলের ধারাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাচ্ছে, শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে কমিশনের স্বাধীন তদন্তের সুযোগ সীমিত হচ্ছে।

আমরা চাই, কথার পাশাপাশি আইনের মধ্যেও সেই স্বাধীনতার সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা থাকুক।

প্রশ্ন : আপনার মতে, এখন সরকারের কী করা উচিত?

সাজ্জাদ হোসেন : বিলটি দ্রুত পাস না করে আরো সময় নিয়ে পর্যালোচনা করতে হবে। গুম কমিশন, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, ভুক্তভোগী পরিবার, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- গুমের অভিযোগের তদন্তে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন কাঠামো নিশ্চিত করা। পুলিশের সহায়তা থাকতে পারে, কিন্তু তদন্তের নিয়ন্ত্রণ স্বাধীন ইউনিটের হাতে থাকতে হবে এবং মানবাধিকার কমিশনের সার্বিক মনিটরিং থাকতে হবে।

মানবাধিকার রক্ষার আইন এমন হতে হবে, যাতে ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে ভয় না পান। এমন কোনো বিধান রাখা উচিত নয়, যা অভিযোগ করার আগেই একজন সম্ভাব্য ভুক্তভোগীকে ভয় দেখায়।

প্রশ্ন : শেষ পর্যন্ত আপনি নতুন বিলটি নিয়ে কী প্রত্যাশা করছেন?

সাজ্জাদ হোসেন : আমরা চাই, এটি কোনো পক্ষের জয়-পরাজয়ের বিষয় না হয়ে মানবাধিকার সুরক্ষার কার্যকর আইন হোক। ইতিবাচক ধারাগুলো রাখা যেতে পারে, কিন্তু স্বাধীন তদন্তের জায়গায় কোনো আপস করা যাবে না।

গুমের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে সত্য উদঘাটনই হতে হবে প্রধান লক্ষ্য। কারণ রাষ্ট্র যদি ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ায়, তাহলে মানুষের আস্থা ফিরে আসবে। আর যদি তদন্তের ক্ষেত্রেই স্বাধীনতা না থাকে, তাহলে যত ভালো ধারাই আইনে লেখা থাকুক, বাস্তবে তা কার্যকর হবে না।

আমাদের বক্তব্য খুব পরিষ্কার- মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীনতা দিতে হবে, বিশেষ করে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে। নইলে আইন যতই সুন্দর হোক, সেটি শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ হিসেবেই বিবেচিত হবে।