- চলমান প্রকল্পে বাদ যাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ
- একীভূত হবে সমজাতীয় প্রকল্প ও কর্মসূচি
বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও হালনাগাদ উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলমান এবং অননুমোদিত নতুন উন্নয়ন প্রকল্পগুলো পুনর্গঠন করতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে প্রকল্পের পরিধি নতুন করে নির্ধারণ এবং উদ্দেশ্য ও ব্যবহার পুনর্নির্ধারণ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগ থেকে একটি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য। বলা হয়েছে, একই ধরনের একাধিক প্রকল্পকে একীভূত করে কর্মসূচিভিত্তিক গুচ্ছ করতে হবে। পাশাপাশি সরকারের অগ্রাধিকারের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ বাদ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের কৃষি ও সমন্বয় অনুবিভাগ থেকে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জারি করা স্মারকে বলা হয়েছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্ত চলমান প্রকল্প এবং ‘সবুজ পাতায়’ থাকা অননুমোদিত নতুন প্রকল্পগুলোকে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। পরিকল্পনা কমিশনের এ উদ্যোগের ফলে আগামী সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্পের সংখ্যা কমে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সাথে একই ধরনের কাজের জন্য আলাদা আলাদা প্রকল্প গ্রহণের প্রবণতা কমিয়ে কর্মসূচিভিত্তিক বাস্তবায়নের দিকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
একাধিক প্রকল্পের কাজ এক প্রকল্পে
পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো তাদের আওতাধীন চলমান এবং সবুজ পাতায় থাকা অননুমোদিত নতুন প্রকল্পগুলোকে দুই বা ততোধিক কর্মসূচির আওতায় ভাগ করবে। এরপর সমজাতীয় প্রকল্পগুলোকে সংশ্লিষ্ট একটি কর্মসূচির অধীনে গুচ্ছাকারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। চলমান প্রকল্পগুলোও বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহার ও সরকারের হালনাগাদ উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়- এমন অসমাপ্ত অঙ্গ প্রকল্প থেকে বাদ দিতে হবে। অন্য দিকে একটি অনুমোদিত প্রকল্পের মধ্যে চলমান অন্য প্রকল্পের সমজাতীয় কাজ সবুজ পাতায় থাকা অননুমোদিত প্রকল্পের সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ অথবা সরকারের অগ্রাধিকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ গুরুত্বপূর্ণ নতুন কাজ যুক্ত করা যাবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তৈরি করতে হবে।
বাঁধ, খাল ও ব্যারাজে গুচ্ছ পদ্ধতির উদাহরণ
এ দিকে প্রকল্প গুচ্ছ করার বিষয়টি বোঝাতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদাহরণ দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সারা দেশে বাঁধ সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ, খাল খনন, ব্যারাজ নির্মাণ এবং পোল্ডার পুনর্বাসনের জন্য পৃথক পৃথক প্রকল্প নেয়ার পরিবর্তে সমজাতীয় কাজগুলো কর্মসূচিভিত্তিকভাবে একত্র করা যেতে পারে। এর মধ্যে সারা দেশের বাঁধ পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের সব প্রকল্পকে একটি কর্মসূচির অধীনে এনে নাম দেয়া যেতে পারে ‘সারা দেশের সব বাঁধ পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার’। একইভাবে দেশের সব খাল খননের প্রকল্পকে ‘সমগ্র বাংলাদেশের খাল খনন কর্মসূচি’ এবং সব ব্যারাজ নির্মাণের প্রকল্পকে ‘ব্যারাজ নির্মাণ’ কর্মসূচির আওতায় নেয়ার উদাহরণ দেয়া হয়েছে।
প্রয়োজনে বদলাবে প্রকল্পের নাম-লক্ষ্যও
পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শুধু প্রকল্পের ব্যয় বা কাজের তালিকা পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন হলে প্রকল্পের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও শিরোনামও নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে। প্রকল্পের কাজ পুনর্বিন্যাসের ফলে যদি প্রকল্পের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং শিরোনাম পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবগুলো কর্মসূচিভিত্তিক গুচ্ছ আকারে সাজিয়ে আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে সদস্য, কার্যক্রম বিভাগ, বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের কাছে পাঠাতে বলা হয়েছে। এরপর সদস্য, ভৌত অবকাঠামো বিভাগের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করবে। কমিটি বিভিন্ন প্রকল্পের বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে জানাবে। সেই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্পের মোট সংখ্যা যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করা হবে।
বিদেশী ঋণের প্রকল্পে সতর্কতা
বিদেশী উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে চলমান প্রকল্পের ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নতুন করে নির্ধারণ এবং উদ্দেশ্য ও ব্যবহার পুনর্নির্ধারণ করতে গিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক কোনো পরিস্থিতি তৈরি করা যাবে না। চুক্তির কোনো বিষয় পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সহযোগীর সম্মতি নিতে হবে। কোনো পরিবর্তনে উন্নয়ন সহযোগী সম্মতি না দিলে সংশ্লিষ্ট বিষয় অপরিবর্তিত রেখেই প্রকল্প পুনর্গঠনের কাজ শেষ করতে হবে।
ইশতেহারে মিলবে না, এমন কাজের কী হবে?
নির্বাচনী ইশতেহার কিংবা সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও বিদ্যমান কোনো প্রকল্পের মধ্যে যেসব কাজ অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে না, সেসব কাজ আলাদা প্রকল্প হিসেবে প্রস্তাব করতে হবে। পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, এসব কাজের সমন্বয়ে নতুন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে অননুমোদিত প্রকল্পের তালিকা বা ‘সবুজ পাতায়’ অন্তর্ভুক্তির জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে হবে।
প্রকল্পের সংখ্যা কমানোই কি মূল লক্ষ্য?
পরিকল্পনা কমিশনের এই উদ্যোগে এক দিকে যেমন সরকারের অগ্রাধিকারের সাথে উন্নয়ন প্রকল্পের সামঞ্জস্য বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্য দিকে প্রকল্পের সংখ্যা যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। একই ধরনের কাজের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অধীনে আলাদা প্রকল্প থাকার ফলে প্রশাসনিক জটিলতা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ব্যয় এবং বাস্তবায়ন তদারকিতে সমস্যা তৈরি হতে পারে। নতুন নির্দেশনার ফলে একই ধরনের কাজকে একটি বড় কর্মসূচির অধীনে আনার সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রকল্প একীভূত করার ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন সক্ষমতা, অর্থায়নের ধরন, প্রকল্প এলাকার ভিন্নতা, ভূমি অধিগ্রহণ, ঠিকাদারি চুক্তি এবং বৈদেশিক ঋণের শর্তগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা না হলে উল্টো প্রকল্প বাস্তবায়ন আরো জটিল হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পের সংখ্যা কমানোই শুধু যথেষ্ট নয়, প্রকল্পের কাজ বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাই হবে- এই উদ্যোগের মূল পরীক্ষা।



