বৃক্ষরোপণ কর্মসুচি আছে, নেই কেবল যথাযথ পরিচর্যা

Printed Edition
রোপণের জন্য চারা হাতে শিক্ষার্থীরা : নয়া দিগন্ত
রোপণের জন্য চারা হাতে শিক্ষার্থীরা : নয়া দিগন্ত

রুহুল আমিন সৌরভ কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)

সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিবছর ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে শত শত গাছের চারা রোপণ করা হয়। পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার লক্ষ্যে এসব বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে সরকারি অর্থও ব্যয় হয় প্রচুর। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, চারা রোপণের পর নিয়মিত পরিচর্যা ও তদারকির অভাবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গাছ আর বাঁচে না। ফলে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির কার্যকারিতা এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।

বর্ষা মৌসুমে কালীগঞ্জে নতুন করে বৃক্ষরোপণের বিভিন্ন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, দিবস বা মৌসুমকেন্দ্রিক কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর রোপণ করা অধিকাংশ চারার আর কোনো খোঁজ থাকে না।

সম্প্রতি সরেজমিন কোলা সড়ক, সুন্দরপুর, চাপরাইল, কোটচাঁদপুর সড়কসহ কয়েকটি গ্রামীণ এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, আগে যেখানে সামাজিক বনায়নের আওতায় গাছ লাগানো হয়েছিল, সেখানে এখন অনেক জায়গায় গাছের অস্তিত্বই নেই। কোথাও রোপণকৃত গাছ আগাছা ও ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে, আবার কোথাও গাছের কোনো অস্তিত্বই নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ দিন পরিচর্যা ও তদারকির অভাবে সামাজিক বনায়নের বেশির ভাগ গাছই নষ্ট হয়ে গেছে।

বন বিভাগ ও স্থানীয় কয়েকটি সামাজিক সংগঠনের সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জলবায়ু পরিবর্তন ও বজ্রপাতের ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে রাস্তার ধারে তালগাছ রোপণেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন সড়ক ও উন্মুক্ত স্থানে পর্যায়ক্রমে তালগাছ লাগানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে পরিবেশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, রোপণের পাশাপাশি চারাগুলোর সুরক্ষা ও নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত না হলে এসব উদ্যোগও প্রত্যাশিত ফল বয়ে আনবে না।

কালীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে উপজেলা পর্যায়ের বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম শুরু করেছে। গত ৩০ জুন এডিবির অর্থায়নে সুন্দরপুর-দুর্গাপুর ইউনিয়নের কমলাপুর-সুন্দরপুর-পান্নাতলা সড়কে ৫০০ গাছের চারা রোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আবু তালিব ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা নাহিদ উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় ও কৃষকদের মধ্যে দুই হাজার ফলদ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করা হয়েছে। কয়েকটি ছাত্রসংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও পৃথকভাবে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

কালীগঞ্জ ইমাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হাফেজ হেদায়েত উল্লাহ বলেন, শুধু গাছ লাগালেই হবে না, সেগুলো দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ ও পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। বন বিভাগ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে তদারকির ব্যবস্থা করলে চারাগুলো বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়বে।

শহীদ নুর আলী কলেজের শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতি বছর বৃক্ষরোপণে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও কতটি গাছ টিকে আছে, তার কোনো জবাবদিহি নেই। শুধু চারা লাগানোর সংখ্যা দিয়ে সাফল্য মূল্যায়ন না করে কতগুলো গাছ বেঁচে থাকল, সেটিকেও মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে।

পরিবেশকর্মী আলমগীর হোসেন বলেন, আগের বছরের চারা বাঁচে না বলেই অনেক সময় একই স্থানে নতুন করে গাছের চারা লাগাতে হয়। এতে পরিবেশগত সুফল যেমন কমে, তেমনি সরকারি অর্থেরও অপচয় হয়। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও পরিচর্যা নিশ্চিত করা জরুরি। পৌর শহরের বাসিন্দা ব্যবসায়ী আবু সাঈদ বলেন, একদিকে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হচ্ছে, অন্যদিকে পুরনো বড় গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। একটি ৪০ বছরের পুরনো গাছ কেটে দশটি চারা লাগালেও সেই ক্ষতি পূরণ হবার নয়। উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।

এ বিষয়ে খুলনা বিভাগীয় বন বিভাগের ডেপুটি রেঞ্জার ওমর ফারুক বলেন, রোপণকৃত সব গাছই যে মারা যায়, একথা ঠিক নয়। বিভিন্ন স্থানে লাগানো গাছ রক্ষায় পাহারাদারও রাখা হয়েছে।

তবে স্থানীয় পরিবেশবাদীদের দাবি, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে কার্যকর করতে হলে শুধু চারা রোপণ করলেই হবে না, সেচ, আগাছা পরিষ্কার, সুরক্ষাব্যবস্থা এবং নিয়মিত তদারকির জন্য পৃথক পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে প্রতিবছর বৃক্ষরোপণের পরও কাক্সিক্ষত সবুজায়ন ও পরিবেশগত সুফল অর্জন করা সম্ভব নয়।