বিশেষ সংবাদদাতা
রাশিয়ায় কাজের উদ্দেশ্য পাড়ি জমানোর পর নিয়োগকারী কোম্পানীর মাধ্যমেই রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেয়া ৩০ কর্মীর ২৬ জনেরই কোনো হদিস মিলছে না। যদিও আহতরা জানিয়েছেন, তাদের সাথে থাকা ১২ জন শ্রমিক ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন। এদিকে দেশটিতে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে যুদ্ধে যাওয়ার পর নিখোঁজ ৩০ কর্মীর সন্ধান বের করতে বাংলাদেশী এবং রাশিয়ান নাগরিকদের সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধি দলকে ইউক্রেন সীমান্তে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তারা কোনো সুরাহা করতে পারেননি। শুধু তাই নয়, তারা কোথায়, কি অবস্থায় আছে তা-ও তারা জানতে ব্যর্থ হয়েছে। আজ সোমবার রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ৩০ কর্মীর সর্বশেষ অবস্থা জানানোর জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে আবারো নোট ভারবাল দেয়া হবে।
অপর দিকে ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত চার বাংলাদেশী শ্রমিক বর্তমানে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করছেন। সেখান থেকে তারা হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কলে তাদের পরিবারের সাথে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন। এ সময় তারা আকুতি জানাচ্ছেন, তাদের যেন সরকার দ্রুত উদ্ধারের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। নতুবা তারাও কেউ বাঁচতে পারবেন না। ভিডিওকলে সোহেল সরকারের কাছে আকুতি জানিয়ে বলেছেন, “আমরা সরকার ও দেশবাসীর কাছে সাহায্য চাই। আমাদের বাঁচান। আমাদের ৩০ জন প্রবাসী ভাইকে তারা বিক্রি করে দিয়েছে। দুই গ্রুপ করেছে। এক গ্রুপে ১৬ জন ছিলাম। সেই গ্রুপের মধ্য থেকে এখন আমরা চারজন হাসপাতালে আছি। ড্রোন হামলায় আহত হয়েছি। আমার হাতে ইনজুরি। কানে কিছু শুনি না। ড্রোন মারছিল আমাদের সবার উপর। বাকিদের হদিস নাই। আরেক গ্রুপে ছিল ১৪ জন। তাদেরও সন্ধান নাই।”
গতকাল রোববার রাশিয়াস্থ মস্কোর বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত মো: নজরুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, দূতাবাস থেকে একটি প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিলাম। তারা গিয়ে ওদের কাউকে ধরতে পারেনি। প্রতিনিধিদের নিখোঁজ বাংলাদেশীদের বিষয়ে একজন রুশ আর্মি কমান্ডার সন্ধান দেয়ার পরিবর্তে উল্টো বলেছেন, “তারা তো স্বেচ্ছায় যুদ্ধে অংশ নিতেই জয়েন করেছে। এর জন্য কর্মীরা সব ধরনের সুযোগ সুবিধার কথা জেনেবুঝে সইও করেছে। একজন কর্মী স্বেচ্ছায় যুদ্ধে গেলে এককালীন ৩৫ লাখ টাকা পাবে, ৩-৪ লাখ টাকা বেতন পাবে। সিটিজেনশিপ পাবে। এসবের প্রলোভনে পড়ে কর্মীরা স্বেচ্ছায় যুদ্ধে যেতে চুক্তিপত্রে সই করেছে। তবে আমাদের কর্মীরা যে কোম্পানিতে কাজ করতে এসেছিল ওই কোম্পানির মালিক তাদের সাথে চিটিংয়ের আশ্রয় নিয়েছিল এমনটাই জানতে পেরেছি। কোম্পানির মালিক ইগোই সেনাবাহিনীর কাছে তাদেরকে সরাসরি বিক্রি করার সাথে জড়িত। আমরা তার বিরুদ্ধে রাশিয়ান আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে রাশিয়ান ফরেন মিনিস্ট্রিতে লিখিত জানিয়েছি। বিএমইটির বহির্গমন ছাড়পত্র না পাওয়ার কারণে এখনো শত শত শ্রমিকের রাশিয়া যাওয়া আটকে আছে। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদের রাশিয়ায় আসতে দূতাবাসের তরফ থেকে কোনো বাধা নেই। দূতাবাসে জনবলের সঙ্কট রয়েছে। তাই কর্মীদের আসার পর বিমানবন্দর থেকে কাউকে রিসিভ করা সম্ভব হবে না। এই মুহূর্তে ৩০ শ্রমিকের মধ্যে চারজন ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন। তারা তাদের পরিবারের সাথে কথা বলে উদ্ধারের আকুতি জানাচ্ছেন। এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, প্রতিনিধি দলের সদস্যরা ফিরে এসে আমাকে জানিয়েছেন, তারা কে কোথায়, কী অবস্থায় আছে তা কোনোভাবেই কেউ জানতে পারবে না। কারণ হিসেবে বলেছে, এই ৩০ কর্মী জেনেশুনে যুদ্ধে যেতে রাশিয়ান ভাষায় লেখা চুক্তির ফরমে সই করে প্রতি মাসে মাসিক কত রুবল বেতন পাবে এবং কি কি সুযোগ সুবিধা পাবে তার সবই জেনে তারপর তারা সই করেছিল। যদিও তারা কেউ রাশিয়ান ভাষার ফরমে কি লেখা রয়েছে তা তারা জানতেন না। আসল কথা হচ্ছে তাদেরকে রুশ সেনাবাহিনী কিনে নিয়ে গেছে। এখন তাদের মধ্যে কেউ মারা গেলে অথবা কেউ বেঁচে থাকলেও সেটি তারা কখনো বলবে না। রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য মতে, এসব নিখোঁজ কর্মীদের সেনাবাহিনীর হেফাজত থেকে ফেরত পাওয়ার আশা ক্ষীণ বলে একজন আর্মি কমান্ডার তার পাঠানো প্রতিনিধি দলকে জানিয়েছে। তারা বলেছে, আর্মি তো তাদের পে করেছে। তাহলে ফেরত দেয়ার কথা আসছে কেন? তারপরও আমি রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রেসার দিয়ে রেখেছি ৩০ কর্মীর সন্ধান দিতে। তাই আজ সোমবার তাদের কার কোথায় অবস্থান রয়েছে সেটি জানাতে দূতাবাসের পক্ষ থেকে নোট ভারবাল দেয়া হবে।
অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, রাশিয়া আসতে চাইছে এমন শ্রমিকরা কোনোভাবেই রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে যাবে না, সেটি নিশ্চিত হওয়ার পরই যেন তাদের ঢাকা থেকে ক্লিয়ারেন্স দেয়া হয়। তার আগে অবশ্যই এসব কর্মীকে রাশিয়ান ভাষার ওপর প্রশিক্ষণ করানো উচিত। কারণ তারা যদি রাশিয়ান ভাষা সামান্যতমও জেনে আসত তাহলে রাশিয়ান কোম্পানির মালিকের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি হতে যেই ফরমে সই করতে দিতে হয় সেটি তারা করত না।
উল্লেখ্য, ৩০ কর্মীকে প্রতারণামূলকভাবে রাশিয়ায় পাঠানোর অভিযোগে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীর নির্দেশে ৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার ও জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়। একই সাথে যুদ্ধে যাওয়া কর্মীদের কূটনৈতিকভাবে উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রাষ্ট্রদূতকে নির্দেশনা দেয়া হয়। এরপর থেকেই রাশিয়াগামী শ্রমিকদের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো কর্মীদের বহির্গমন ছাড়পত্র দেয়া আপাতত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে গত বৃহস্পতিবার বিএমইটির পরিচালক (বহির্গমন) তার দফতরে অপেক্ষমাণ কর্মীদের ইন্টারভিউ নিয়েছেন বলে জানিয়েছে একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক। ইন্টারভিউ এর প্রথম শর্তই ছিল যুদ্ধে যাবে না এটি নিশ্চিত করা। তবে ব্যুরোর এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমানো কর্মীদের বহির্গমন ছাড়পত্র প্রদানে গড়িমসির পাশাপাশি বিভিন্নভাবে হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফাইল আটকে রাখারও অভিযোগ রয়েছে। তার কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ব্যুরোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ। শোনা যাচ্ছে, তাকে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ দফতর থেকে সরিয়ে দেয়া হতে পারে। এমন গুঞ্জন উঠার পরই তিনি আরো বেপরোয়া আচরণ করছেন। এসব প্রসঙ্গে জানতে গত বৃহস্পতিবার পরিচালক (বহির্গমন) মো: তাজিম-উর-রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, মিডিয়া সংক্রান্ত কোনো তথ্য জানতে হলে মিডিয়া সেলের দায়িত্বশীলদের সাথে কথা বলতে।



