ফয়সাল আহমেদ বড়লেখা (মৌলভীবাজার)
একটি আমগাছ রোপণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল শখের বাগান। সময়ের ব্যবধানে সেই উদ্যোগ এখন রূপ নিয়েছে দেশী-বিদেশী শতাধিক জাতের ফলের সমৃদ্ধ সংগ্রহশালায়। মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের সরিয়া গ্রামের বাসিন্দা রেজাউল করিম খন্দকারের প্রায় দুই একরজুড়ে গড়ে ওঠা ফলবাগান এখন ফলপ্রেমী, কৃষি উদ্যোক্তা ও দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ।
সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, পরিকল্পিতভাবে সাজানো বাগানজুড়ে সারি সারি ফলগাছ। কোথাও ঝুলছে বিভিন্ন জাতের আম, কোথাও কমলা, ডালিম, ড্রাগন, লংগান, আঙুরসহ নানা দেশী-বিদেশী ফল। প্রতিটি গাছের সাথে ফলের নাম ও জাত উল্লেখ করে ফলক লাগানো হয়েছে, যা বাগানটিকে যেমন দৃষ্টিনন্দন করেছে, তেমনি দর্শনার্থীদের জন্য তথ্যবহুলও করে তুলেছে।
রেজাউল করিম জানান, ২০১৭ সালে একটি আমগাছ লাগানোর মধ্য দিয়ে তার এই যাত্রা শুরু। পরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও বিদেশ থেকে উন্নত জাতের ফলের চারা সংগ্রহ করে ধীরে ধীরে বাগানটি সম্প্রসারণ করেন। বর্তমানে তার বাগানে শতাধিক জাতের ফলের গাছ রয়েছে, যার অনেকগুলোই বাংলাদেশে বিরল।
বাগানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ৫০টির বেশি জাতের আম। চলতি মৌসুমে এর মধ্যে প্রায় ৩৭টি জাতে ফল এসেছে। সংগ্রহে রয়েছে আলফানসো, আমেরিকান কেন্ট, হিমসাগর, চেং মাই, পাকিস্তানি চোষা, আমেরিকান পালমা, সামার বেহেস্ত, ন্যাম ডকমাই, হাঁড়িভাঙা, আম্রপালি, ভ্যালেন্সিয়া প্রাইড, ব্রুনাই কিং, সাদা পুনাই ও সি-মুয়াংসহ দেশী-বিদেশী নানা জাতের আম। এ ছাড়া বাগানে রয়েছে কমলা, মাল্টা, ডালিম, লংগান, ড্রাগন, ত্বীন (ফিগ), ব্ল্যাকবেরি, লুকাট, স্ট্রবেরি, রামবুটান, সালাক, গোলাপ জাম, আঙুর, সফেদা, শরিফা, আতাফল, মিরাকেল বেরি, ব্ল্যাক সুরিনাম চেরি, ব্রাজিল পেয়ারা, হানি কামকুয়াট ও চুপাচুপাসহ বিভিন্ন বিরল ফল। বিশেষ করে বিভিন্ন জাতের লংগানের সমৃদ্ধ সংগ্রহ বাগানটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
চলতি মৌসুমে দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে কিছু ক্ষতির মুখেও পড়েছেন তিনি। রেজাউল করিম বলেন, সেচের মোটর বিকল হয়ে দুই দিন পানি দিতে না পারায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আম ঝরে গেছে। এরপরও নাচ-১, নাচ-৩, সামার বেহেস্ত, আমেরিকান কেন্ট ও আমেরিকান পালমা জাতের ভালো ফলন হয়েছে। ব্যানানা জাতের একটি গাছে প্রায় ২০০টি আম ধরেছে। অন্য দিকে ব্রুনাই কিং জাতের একটি আমের ওজন ইতোমধ্যে প্রায় চার কেজি হয়েছে, যা পাঁচ কেজি পর্যন্ত হতে পারে বলে তার আশা।
তিনি জানান, এটি তার কাছে বাণিজ্যিক প্রকল্প নয়; বরং ভালোবাসার একটি উদ্যোগ। পরিবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতজনকে নিরাপদ, ফরমালিনমুক্ত ফল উপহার দিতেই তিনি বেশি আনন্দ পান। বাগানের পরিচর্যায় তিনি রাসায়নিক সারের পরিবর্তে নিজস্বভাবে তৈরি জৈবসার ব্যবহার করেন। তবে বানর ও কাঠবিড়ালের উপদ্রব তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বড়লেখা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মনোয়ার হোসেন বলেন, পতিত টিলা ও পাহাড়কে ফলচাষের আওতায় এনে রেজাউল করিম একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার এ উদ্যোগ দেশের অন্যান্য কৃষক ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। তিনি জানান, কৃষি বিভাগ আগ্রহী উদ্যোক্তাদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে আসছে এবং ভবিষ্যতেও এ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।



