সংশোধিত বাজেট ২০২৫-২৬

রাজস্বে গতি, উন্নয়নে কাটছাঁট ঘাটতি কমাতে ব্যয় হ্রাস ব্যাংক ঋণের নির্ভরতা বৃদ্ধি

Printed Edition
রাজস্বে গতি, উন্নয়নে কাটছাঁট ঘাটতি কমাতে ব্যয় হ্রাস ব্যাংক ঋণের নির্ভরতা বৃদ্ধি
রাজস্বে গতি, উন্নয়নে কাটছাঁট ঘাটতি কমাতে ব্যয় হ্রাস ব্যাংক ঋণের নির্ভরতা বৃদ্ধি

বিশেষ সংবাদদাতা

২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট দেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। রাজস্ব আহরণে কিছুটা আশাবাদ দেখা গেলেও উন্নয়ন ব্যয়ে বড় ধরনের কাটছাঁট, বৈদেশিক অর্থায়নের ঘাটতি এবং ব্যাংকঋণের ওপর বাড়তি নির্ভরতা অর্থনীতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অর্থ বিভাগ প্রকাশিত সংশোধিত বাজেটের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার রাজস্ব আদায় বাড়ানোর চেষ্টা করলেও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজেট ঘাটতি কমানোর পথ বেছে নিয়েছে।

মূল বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ছিল পাঁচ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকার অতিরিক্ত ২৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহের প্রত্যাশা করছে। এর মধ্যে কর রাজস্ব চার লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে করবহির্ভূত আয়ে। এই খাতে লক্ষ্যমাত্রা ৪৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে তিন লাখ ৩১ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৫৬ শতাংশ। অর্থবছরের বাকি তিন মাসে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য রাজস্ব আহরণে উল্লেখযোগ্য গতি আনতে হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, করবহির্ভূত আয় বৃদ্ধির পেছনে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ, ফি, চার্জ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক প্রাপ্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

উন্নয়ন ব্যয়ে বড় কাটছাঁট

সংশোধিত বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে আনা। মূল বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল দুই লাখ ৪৫ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে দুই লাখ ১৪ হাজার ৮৬২ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৩০ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা কমানো হয়েছে।

একইভাবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে দুই লাখ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এডিপি থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কর্তন করা হয়েছে।মার্চ পর্যন্ত উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র ৫৭ হাজার ৭২ কোটি টাকা, যা সংশোধিত বরাদ্দের এক-চতুর্থাংশেরও কম। এডিপির ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৫৫ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা। এটি নির্দেশ করে যে, অর্থনৈতিক চাপ মোকাবেলায় সরকার নতুন প্রকল্প গ্রহণের পরিবর্তে বিদ্যমান প্রকল্পগুলো সীমিত পরিসরে এগিয়ে নেয়ার কৌশল অনুসরণ করছে।

পরিচালন ব্যয় বাড়ছেই

উন্নয়ন ব্যয় কমলেও পরিচালন বা আবর্তক ব্যয় বেড়েছে। মূল বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল চার লাখ ৯৮ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা বেড়ে পাঁচ লাখ ১৩ হাজার ৩৬২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। মার্চ পর্যন্ত পরিচালন ব্যয় হয়েছে তিন লাখ ১৩ হাজার ৮২০ কোটি টাকা।

সরকারি বেতনভাতা, ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধিই পরিচালন ব্যয় বাড়ার প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

মূল বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছিল দুই লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে দুই লাখ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। জিডিপির অনুপাতে ঘাটতি ৩.৬ শতাংশ থেকে কমে ৩.৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

প্রথম দৃষ্টিতে এটি ইতিবাচক মনে হলেও এর পেছনে রাজস্ব বৃদ্ধির চেয়ে উন্নয়ন ব্যয় সঙ্কোচনের ভূমিকা বেশি। ফলে ঘাটতি কমানোর এই পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

বৈদেশিক অর্থায়নে ধাক্কা

সংশোধিত বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈদেশিক অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাপকভাবে কমে যাওয়া। মূল বাজেটে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নের লক্ষ্য ছিল এক লাখ এক হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৬৩ হাজার কোটি টাকায় নামানো হয়েছে। অর্থাৎ ৩৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক অর্থায়ন কমে গেছে। মার্চ পর্যন্ত এ খাতে প্রকৃত প্রবাহ ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। হিসাব অনুযায়ী বৈদেশিক উৎস থেকে নিট অর্থায়ন হয়েছে ঋণাত্মক সাত হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ নতুন ঋণ প্রাপ্তির তুলনায় ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেশি হয়েছে। এটি বৈদেশিক ঋণ প্রবাহে ধীরগতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে।

ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে

বৈদেশিক অর্থায়ন কমে যাওয়ায় সরকারকে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর আরো বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। সংশোধিত বাজেটে অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের লক্ষ্য এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের লক্ষ্য এক লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত সরকার ব্যাংক খাত থেকে এক লাখ দুই হাজার ৪৪২ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮৭ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, সরকারের এই অতিরিক্ত ঋণগ্রহণ বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সঙ্কুুচিত করতে পারে। ফলে শিল্প বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনীতির জন্য কী বার্তা?

২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট মূলত একটি সঙ্কট-পরিচালনামূলক বাজেট। এখানে সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা, ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং বৈদেশিক অর্থায়নের ঘাটতি পূরণ করা; কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য উন্নয়ন ব্যয়ে বড় ধরনের কাটছাঁট করা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকে মন্থর করতে পারে।

এক দিকে রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জ, অন্য দিকে বৈদেশিক ঋণ প্রবাহের দুর্বলতা এবং ব্যাংক-ঋণের ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা, সবমিলিয়ে সংশোধিত বাজেট বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে বিদ্যমান চাপগুলোকেই আরো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।