আবুল কালাম আজাদ, বগুড়া অফিস
বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জুলাই সনদে বিএনপি প্রথম স্বাক্ষর করেছে। এরপর অন্যান্য রাজনৈকি দল স্বাক্ষর করেছে। বিএনপি সরকার জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু এ ঘোষণার পরও কিছু রাজনৈতিক দল জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তারা জনগণের কল্যাণকর কাজ না করে সংস্কার আর সংস্কার নিয়ে বিভ্রান্তিকর কথা বলছে। যারা দেশের অস্তিত্ব আর নারী স্বাধীনতার কথা বলে না আমরা কিভাবে তাদের বিশ^াস করতে পারি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। ইতোমধ্যে নারীদের জন্য ফ্যামিলী কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড, সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি লোন মওকুফ, মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, প্যাগোডার ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী প্রদান, খাল খনন, কাজ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এসব কাজে জনগণের সহযোগিতা লাগবে। দেশের মানুষ বিগত নির্বাচনে দেশ পরিচালনার জন্য বিএনপিকে পাঁচ বছরের দায়িত্ব দিয়েছে। আমি বগুড়ার সন্তান, আপনাদের সন্তান। দেশ পরিচালনায় আপনাদের সহযোগিতা চাই।
গতকাল সোমবার বিকেলে বগুড়া শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে বগুড়া জেলা বিএনপি আয়োজিত বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা এমপির সভাপতিত্বে জনসভায় আরো বক্তব্য দেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) মোশারফ হোসেন এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক সহিদ উন নবী সালাম ও কে এম খায়রুল বাশার, জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমা আকতার, জেলা যুবদল সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম, স্বেচ্ছাসেবক দল সভাপতি সরকার মুকুল ও ছাত্রদল সভাপতি হাবিবুর রশিদ সন্ধান। জনসভা মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী পতœী ডা: জুবাইদা রহমান, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি, গোলাম মো: সিরাজ এমপি, কাজী রফিকুল ইসলাম এমপি, আব্দুল মহিত তালুকদার এমপিসহ স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বেগম খালেদা জিয়া ২০১৬ সালে ভিশন ২০৩০ এবং আমি ২০২৩ সালে ৩১ দফা রাষ্ট্র মেরামত ও সংস্কার প্রস্তাব দেই। কিন্তু তখন অন্য কোনো দলই সংস্কারের ‘স’ উচ্চারণ করেনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার সরকার পালিয়ে যাওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কার কমিশন গঠন করলে সেখানে বিএনপি অংশ নিয়ে কিছু বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে সংবাদ সম্মেলনে জাতিকে জানিয়েছে। এরপর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রথমে বিএনপি ও পরে অন্যান্য দল জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু এখন সংসদের ভিতরে ও বাইরে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু রাজনৈতিক দল জনগণকে বিভ্রান্ত করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচার সরকার মানুষের গণতন্ত্র হত্যা, বাকস্বাধীনতা হরন, মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতি এবং বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করে সব কিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। সব রাজনৈতিক দলের আন্দোলনে ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে স্বৈরাচার পালিয়ে গেলে জনগণের ভোটাধিকার ফিরে আসে। এরপর তারা বিএনপিকে নির্বাচিত করে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়।
তারেক রহমান বলেন, আজ ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছি। একটি দল সংস্কার সংস্কার বলে কিন্তু তারা নারী স্বাধীনতায় বিশ^াস করে না। তারা দেশের অস্তিত্বে বিশ^াস করে না। তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চায়। বগুড়াবাসীকে তাদের সম্পর্কে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। তিনি আরো বলেন, আমরা তাদের বিভ্রান্তিতে পা দেবো না। তারা দেশে গোলযোগ সৃষ্টি করতে চায়। তাই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা চাই। প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার উন্নয়ন প্রসঙ্গে বলেন, বগুড়াবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ কাজ শিগগিরই শুরু করা হবে। বগুড়া তথা উত্তরাঞ্চলে উৎপাদিত কৃষি পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে বগুড়া বিমান বন্দরে যাত্রীপরিবহনের সাথে কার্গো বিমান চালু করা হবে। এ ছাড়া বগুড়া বিশ^বিদ্যালয় স্থাপনসহ বগুড়ার উন্নয়নে সব কিছু করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী পরে নবনির্মিত বগুড়া প্রেস ক্লাব ভবন উদ্বোধন এবং বায়তুর রহমান সেন্ট্রাল মসজিদ পুনর্নির্মাণ কাজের ফলক উন্মোচন করে মুনাজাত করেন।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু
গতকাল বগুড়া সিটি করপোরেশনের নামফলক উন্মোচন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মাধ্যমে বগুড়াবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হলো। দেশের ১৩তম সিটি করপোরেশনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আজ বগুড়াবাসীর খুশির দিন। শহরটি আনুষ্ঠানিকভাবে সিটি করপোরেশন হিসেবে যাত্রা শুরু করল। তবে কিছু কাজ এখনো বাকি রয়েছে। সোমবার দুপুর ১২টায় বগুড়া সিটি করপোরেশনের নামফলক উন্মোচন করে নেতাকর্মী ও জনগণের উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। পৌরসভার বিদ্যমান আয়তন প্রায় ৭০ বর্গকিলোমিটার ও ২১টি সাধারণ ওয়ার্ড নিয়ে নতুন সিটি করপোরেশন করা হলো। বর্তমানে এখানে জনসংখ্যা প্রায় ছয় লাখ ও ভোটার তিন লাখের বেশি।
তারেক রহমান বলেন, প্রশাসন তাদের কাজ করবে। কিন্তু শহরের রাস্তাঘাট নিজেদেরই পরিষ্কার রাখতে হবে। বগুড়া শহরকে মডেল টাউন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সিটি করপোরেশনের যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকে সে কাজগুলো ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত করার চেষ্টা করেছিলাম আমরা। এর আগে তিনি বগুড়া আইনজীবী সমিতির নতুন ভবনের উদ্বোধন ও জেলা জজ আদালতে বগুড়াসহ সাত জেলার ই- বেইলবন্ড কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। জজ আদালতের অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান, প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা: জোবায়দা রহমান, সংসদ সদস্যরা, সরকারি কর্মকর্তা, বিচারক ও আইনজীবী নেতারা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী এরপর জেলার গাবতলী উপজেলার শহীদ জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান বাগবাড়ীর উদ্দেশে রওনা হয়ে বেলা পৌনে ১টায় জিয়াউর রহমান গ্রাম হাসপাতালে হামের টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এরপর তিনি সেখানে মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। অনুষ্ঠানে ডা: জেবায়দা রহমান, বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা: মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, সাবেক এমপি হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু উপস্থিত ছিলেন। এরপর তিনি স্থানীয় শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেন, ডা: জোবায়দা রহমান উপস্থিত ছিলেন। পরে তিনি স্থানীয় চৌকিরদহ খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন শেষে জিয়া বাড়ী পরিদর্শন ও বিশ্রাম নেন।
ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ
গাবতলী (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, দেশের গ্রামীণ হতদরিদ্র নারীদের আত্মনির্ভরশীল ও সচ্ছল করতেই সরকার ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
গতকাল সোমবার দুপুরে বগুড়া গাবতলীর নশিপুরের বাগবাড়ীতে শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরো বলেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকারের লক্ষ্যই হচ্ছে, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারকে আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলা। সেই জন্যই আমরা ফ্যামিলি কার্ড দিয়েছি।
অনুষ্ঠান মঞ্চে ১০ জন নারী পরিবার প্রধানের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তার পাশে ছিলেন তার সহধর্মিণী ডা: জুবাইদা রহমান।
উপজেলার মোট ৯৩৮ জন নারীকে এই ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হয়। ফ্যামিলি কার্ডপ্রাপ্ত ভারতী রানী, শ্যামলী আক্তার, বাবলি বেগম খুশিতে আবেগাপ্লুত হয়ে তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। জীবনে স্বপ্নেও ভাবিনি এই কার্ড হাতে পাব। এই টাকা দিয়ে আমার পরিবারের অনেক সাহায্য হবে। আমরা সুখে থাকতে পারব।
এ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাগবাড়ীতে জিয়াউর রহমান গ্রাম হাসপাতালে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন ও চৌকিরদহ খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন করেছেন।
শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে ফ্যামিলি কার্ড উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আবু জাফর মো: জাহিদ হোসেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ।



