সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার

আপিল বিভাগের সর্বসম্মত রায়ে পুনর্বহাল

Printed Edition
সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার
সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার

আলমগীর কবির

দীর্ঘ ১৪ বছর পর বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় আবারো সাংবিধানিক বৈধতা পেল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের যে রায় ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্ট দিয়েছিলেন, এবার তা বাতিল ঘোষণা করেছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এর ফলে ১৯৯৬ সালে প্রবর্তিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হলো।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে এই ঐতিহাসিক রায় দেন। ২০১১ সালের ওই রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা দু’টি পৃথক আপিল এবং চারটি পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) আবেদন মঞ্জুর করে আদালত এই সিদ্ধান্ত জানান।

সংক্ষিপ্ত রায়ে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরলেও আসন্ন জাতীয় নির্বাচন কিভাবে হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন আদালত। রায়ে বলা হয়েছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে। তবে পরবর্তী অর্থাৎ চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে পুরনো সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কার্যকর হবে। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা জানা যাবে বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন।

প্রেক্ষাপট ও আইনি লড়াই : গত ১১ নভেম্বর প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি শেষ হয়। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায়টি পুনর্বিবেচনার জন্য বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট নাগরিক আবেদন করেছিলেন।

ইতিহাসের বাঁক বদল : ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু হয়েছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ৯০ দিনের জন্য দায়িত্ব নিয়ে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা। কিন্তু ২০১১ সালের ১০ মে সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন আপিল বিভাগ এক রায়ে এই সংশোধনীটিকে অবৈধ ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করেন।

আদালতের সেই রায়ের ওপর ভিত্তি করে ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ করা হয়। ওই বছরের ৩ জুলাই এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়েছিল। গতকালের রায়ের মধ্য দিয়ে সেই পঞ্চদশ সংশোধনীর মূল আইনি ভিত্তিটিই অকার্যকর হয়ে পড়ল বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।

রায়ের ব্যাখ্যায় যা বললেন আইনজীবীরা : তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দেয়া ঐতিহাসিক রায়ের আইনি ব্যাখ্যা ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করার পাশাপাশি এটি কবে থেকে কার্যকর হবে এবং এর খুঁটিনাটি নিয়ে কথা বলেছেন তারা। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আপিল বিভাগ সর্বসম্মতিক্রমে ২০১১ সালের রায়টি বাতিল করেছেন। আদালত একে ‘প্রস্পেক্টিভ ইফেক্ট’ দিয়েছেন। অর্থাৎ, আগামী সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর থেকে এই রায় কার্যকর হবে। এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল হলো।’

অ্যাটর্নি জেনারেল ২০১১ সালের রায় প্রদানকারী বিচারপতিদের সমালোচনা করে বলেন, ‘আইন অনুযায়ী প্রকাশ্য আদালতে যা ঘোষণা করা হয়, সেটিই রায়। কিন্তু তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকসহ অন্যরা প্রকাশ্য আদালতে ঘোষিত রায় পরবর্তীতে নিজেদের ইচ্ছামতো পরিবর্তন করেছিলেন, যা দণ্ডবিধির ২১৯ ধারা অনুযায়ী অপরাধ।’ দেশের বিচারব্যবস্থা রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট রায় দেয় কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, তিনি সেটি মনে করেন না। কোন রায় রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট, আর কোন রায় আইনি ব্যাখ্যায় দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষা করবে, গণতন্ত্র রক্ষা করবে, মানুষের ভোটাধিকার রক্ষা করবে, আইনের শাসন রক্ষা করবে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্বহাল করবে, তা জাতি বিবেচনা করবে। আসাদুজ্জামান বলেন, আজকের (গতকাল বৃহস্পতিবার) রায়ে আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল হলো। এটা কার্যকর হবে পরবর্তী সংসদ ভাঙার পরের ১৫ দিনের মধ্যে। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আনা হয়েছিল। সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক না বলে তা সাংবিধানিক হিসেবেই রায়ে ঘোষিত হলো। তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে ফুল জাজমেন্টে আসবে বলে মনে করেন তিনি। জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার যে রূপরেখা আছে, তার পরিবর্তন সম্ভব হবে কি না, জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘পার্লামেন্টের কিছু ডিসকাশন থাকবে। ২০ বছর পরে জনগণ যদি মনে করে এই ব্যবস্থা পচে গলে গেছে, এর থেকেও ভালো কোনো ব্যবস্থা গণতন্ত্র সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন, তাহলে অবশ্যই পার্লামেন্টের ডিসকাশন থাকবে।’

এদিকে রায় ঘোষণার পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় সংবিধানের ৫৮(১) এবং ৫৮(২) অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল হলো। এর অর্থ হলো তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা আবার ফিরে এলো। আজ শুধু বিএনপি নয়, সারা জাতি খুশি। আমাদের কাছে মনে হচ্ছে আজ ঈদের দিন।’

এ দিকে রায়ের কার্যকারিতা বা ‘প্রয়োগকাল’ নিয়ে ব্যাখ্যা দেন বিএনপির আরেক আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেন, “আদালত বলেছেন, এর কার্যকারিতা হবে ‘প্রস্পেক্টিভলি’ (ভবিষ্যৎমুখী)। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া চালাচ্ছে, তা অব্যাহত থাকবে। আজকের রায়ে এটি স্পষ্ট যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে ফিরে এলেও আসন্ন নির্বাচনটি এর অধীনে হবে না। এর কার্যকারিতা শুরু হবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের পর থেকে।”

জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির রায়ের আইনি দিকগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘রায়ে বলা হয়েছে, অতীতে (২০১১ সালে) যে রায় দেয়া হয়েছিল তা ছিল ‘টেইন্টেড’ বা কলঙ্কিত। দেখামাত্রই বোঝা যায় সেই রায়টি ত্রুটিপূর্ণ ছিল। তাই ত্রয়োদশ সংশোধনী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে যে রায় দেয়া হয়েছিল, তা আজ সম্পূর্ণভাবে বাতিল ঘোষণা করা হলো।’

তিনি আরো বলেন, ‘ইংরেজি পরিভাষায় আদালত বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ‘রিভাইভড অ্যান্ড রেস্টোর্ড’ (পুনরুজ্জীবিত ও পুনঃস্থাপিত)। তবে এটি কার্যকর হওয়ার বিষয়টি সংবিধানের ৫৮(খ) ও ৫৮(গ) অনুচ্ছেদের ওপর নির্ভরশীল। ৫৮(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ ভেঙে যাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হয়। যেহেতু বর্তমানে সংসদ নেই, তাই এই মুহূর্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সুযোগ নেই। ফলে এই রায়টি কার্যকর হবে ‘প্রস্পেক্টিভলি’ অর্থাৎ, চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় থেকে।

পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার সাথে সঙ্ঘাত হবে কি? পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার সাথে এই রায়ের কোনো আইনি সঙ্ঘাত হবে কী না- এমন প্রশ্নের জবাবে শিশির মনির বলেন, ‘পঞ্চদশ সংশোধনীতে শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়, আরো প্রায় ২৯টি বিষয় ছিল। হাইকোর্ট ইতোমধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সংক্রান্ত অংশটি বাতিল করেছেন, যার বিরুদ্ধে আপিল শুনানির অপেক্ষায় আছে। তবে আজকের রায়ে যেহেতু মূল বাধাটি অপসারিত হলো, তাই পঞ্চদশ সংশোধনীর মামলায়ও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দু’টি রায় সাংঘর্ষিক হওয়ার সুযোগ নেই।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন, তা নিয়ে তিনি বলেন, ‘পুরনো বিধানে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার কথা। তবে ‘জুলাই চার্টার’ বা সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো নিয়ে চারটি বিকল্প প্রস্তাব রয়েছে। গণভোট ও সংবিধান সংস্কার সভায় যদি এই কাঠামো পরিবর্তন করা হয়, তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনেও আমূল পরিবর্তন আসতে পারে।’

রিটকারীর আইনজীবীর বক্তব্য : সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনার অন্যতম আবেদনকারী বদিউল আলম মজুমদারের আইনজীবী ড. শরীফ ভুঁইয়া বলেন, ‘আমরা আদালতের নজরে সংবিধানের ৫৮(গ) অনুচ্ছেদটি এনেছিলাম। সেখানে স্পষ্ট বলা আছে, সংসদ ভেঙে দেয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হতে হবে। যেহেতু এক বছরেরও বেশি আগে সংসদ ভেঙে দেয়া হয়েছে, তাই এখন এটি গঠন করা সম্ভব নয়। আমরা খুশি যে আদালত আমাদের যুক্তি গ্রহণ করে রায়টি ভবিষ্যৎমুখী হিসেবে ঘোষণা করেছেন।’

যেভাবে এলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা : দেশের রাজনীতিতে অন্যতম আলোচিত অধ্যায় ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা’। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামোর প্রশ্ন নয়, বরং রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আস্থাহীনতা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে চলমান সঙ্কটের একটি দালিলিক প্রতিফলন। মূলত দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কারণেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘তত্ত্বাবধায়ক’ বা ‘কেয়ারটেকার’ সরকার ধারণার জন্ম হয়।

এই ব্যবস্থার উৎপত্তি এক বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনটি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। তবে সঙ্কট ঘনীভূত হয় ১৯৯৪ সালে মাগুরা উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠার পর। তখন ‘দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়’ এই দাবিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সাংবিধানিক রূপ পায়।

সংবিধানের এই সংশোধনীতে বলা হয়, নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষে একটি নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকার দেশের শাসনভার গ্রহণ করবে। এই সরকারের প্রধান কাজ হবে দায়িত্ব গ্রহণের ৯০ দিনের মধ্যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন নিশ্চিত করা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচন দু’টি ছিল তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য। যার ফলে উভয় নির্বাচনেই শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা সম্ভব হয়েছিল।