‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ পদ্মার মিডল চর

রাজশাহীতে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা

Printed Edition

মুহা: আব্দুল আউয়াল রাজশাহী ব্যুরো

পদ্মার বুকে বিস্তীর্ণ চর। চারদিকে সাদা বালুর বিস্তার, নদীর জলরাশি, খোলা আকাশ আর দিগন্তজোড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। ঋতুর সাথে সাথে বদলে যায় চরের রূপ। বর্ষায় নদীর জলরাশি, আর শুষ্ক মৌসুমে জেগে ওঠে বিস্তীর্ণ বালুচর। প্রকৃতির এ পরিবর্তনশীল রূপই রাজশাহীর পদ্মার মিডল চরকে করেছে অনন্য। জায়গাটি এখন পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে।

‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামটি মূলত চরের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের প্রতীকী উপমা। বিস্তীর্ণ বালুর ওপর নদীর জলরাশি, দূরে সবুজের রেখা, খোলা আকাশ ও উন্মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ মিলে এখানে তৈরি হয় মনোমুগ্ধকর দৃশ্যপট। বিশেষ করে শীত ও শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার বুকে দীর্ঘ বালুচর জেগে উঠলে নদী, বালু ও আকাশের মিলিত সৌন্দর্য সহজেই দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে পারে। দিনের বিভিন্ন সময়ে সূর্যের আলো ও ছায়ার পরিবর্তনে বদলে যায় চরের দৃশ্যও।

শহরের কোলাহল থেকে খুব বেশি দূরে নয়, অথচ নাগরিক জীবনের বাইরে প্রকৃতির একেবারে কাছে থাকা এ চরকে ঘিরে রাজশাহীতে তৈরি হচ্ছে নতুন পর্যটন সম্ভাবনা। পরিকল্পিত উদ্যোগ, নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে পদ্মার মিডল চর হতে পারে রাজশাহীর অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য। নদী, বালুচর, নৌভ্রমণ, সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত এবং চরাঞ্চলের জীবনযাত্রাকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠতে পারে ভিন্নধর্মী নদীকেন্দ্রিক পর্যটন।

রাজশাহীর পর্যটন মানচিত্রে মিডল চর যুক্ত হলে প্রকৃতি ও নদীকেন্দ্রিক পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। বর্তমানে রাজশাহীর অন্যতম আকর্ষণ পদ্মার তীর। এর পাশাপাশি রয়েছে ঐতিহাসিক স্থাপনা, বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, পুঠিয়ার মন্দিরনগরীসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। এ সবের সাথে মিডল চরকে যুক্ত করা গেলে নদী, চর ও গ্রামীণ জীবনকে কেন্দ্র করে নতুন একটি পর্যটন সার্কিট তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

বিশেষ করে শীত মৌসুমে বিস্তীর্ণ বালুচরে হাঁটা, নদীর বুকে নৌভ্রমণ, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ, প্রকৃতির ছবি তোলা কিংবা পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সাথে সময় কাটানোর সুযোগ দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে পারে। একই সাথে স্থানীয় খাবার, কৃষিপণ্য, গ্রামীণ সংস্কৃতি ও চরবাসীর জীবনযাত্রাকে পর্যটনের সাথে যুক্ত করা গেলে এটি শুধু বিনোদন কেন্দ্র নয়, প্রকৃতি ও সংস্কৃতিনির্ভর একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।

তবে এ সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জ নিরাপত্তা। মিডল চর একটি নদীকেন্দ্রিক ও মৌসুমি চর হওয়ায় স্থলভাগের প্রচলিত পর্যটনকেন্দ্রের তুলনায় এখানকার ঝুঁঁকিও ভিন্ন। নৌপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নিরাপদ ও অনুমোদিত নৌযান নিশ্চিত করা, নৌযানে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত লাইফ জ্যাকেট রাখা, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন বন্ধ করা এবং দক্ষ চালক নিশ্চিত করা জরুরি। আবহাওয়া ও নদীর পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নৌযান চলাচলের ব্যবস্থাও করতে হবে। বিশেষ করে ঝড়, বৃষ্টি বা নদীর স্রোত বেড়ে গেলে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

চরের বিভিন্ন অংশে নদীর গভীরতা ও বালুর প্রকৃতি একরকম নয়। কোথাও বালু শক্ত, কোথাও নরম বা ভাঙনপ্রবণ। নদীর স্রোতও সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপদ চলাচলের এলাকা নির্ধারণ, ঝুঁঁকিপূর্ণ অংশে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে যাতায়াত সীমিত করার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। পানিতে নামার প্রবণতা বিবেচনায় নিরাপদ স্থানে নির্ধারিত ‘সেফ জোন’ তৈরি করা যেতে পারে। শিশু ও পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধারের জন্য প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী, লাইফ বয়া, উদ্ধার নৌযান, প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা দরকার।

পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা, জরুরি যোগাযোগ নম্বর প্রদর্শন এবং পর্যাপ্ত আলোকসজ্জার ব্যবস্থাও প্রয়োজন হবে। নৌঘাট ও সমাগমস্থলে প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মী ও প্রয়োজনীয় নজরদারি ব্যবস্থা থাকলে নিরাপত্তা-ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

মিডল চরের বড় সম্পদ তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। তাই পর্যটন উন্নয়নের নামে অতিরিক্ত কংক্রিটের স্থাপনা, অপরিকল্পিত দোকানপাট, প্লাস্টিক বর্জ্য, শব্দদূষণ কিংবা অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হলে যে সৌন্দর্যের কারণে চরটি ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে, সেটিই এক সময় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে শুরু থেকেই পরিবেশবান্ধব পর্যটন ধারণাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

দর্শনার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে বসা ও বিশ্রামের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ডাস্টবিন, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সাথে নদী ও চরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের ওপর পর্যটনের প্রভাবও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

পদ্মার চরাঞ্চলের আরেকটি বাস্তবতা হলো এর ভৌগোলিক পরিবর্তনশীলতা। বর্ষায় নদীর পানি বাড়লে চরের বড় অংশ পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। আবার শুষ্ক মৌসুমে নতুন নতুন বালুচর জেগে ওঠে। কোথাও ভাঙন দেখা দিতে পারে, পরিবর্তিত হতে পারে নদীর গতিপথও। তাই এখানে স্থায়ী ও ভারী অবকাঠামোর পরিবর্তে নদীর গতিপ্রকৃতি ও মৌসুমি পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ স্থাপনা ও পরিকল্পনা প্রয়োজন। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে বা চরের ভূপ্রকৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হলে তা ভবিষ্যতে পরিবেশ ও নদী-দুইয়ের জন্যই ঝুঁঁকি তৈরি করতে পারে।

পর্যটনের বিকাশ হলে এর সরাসরি সুফল পেতে পারেন চরাঞ্চলের মানুষ। পরিকল্পিতভাবে পর্যটন কার্যক্রম চালু করা গেলে স্থানীয় তরুণদের নৌযান পরিচালনা, পর্যটক গাইড, নিরাপত্তা ও উদ্ধারকাজ, খাবারের দোকান, পরিবহন, পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যান্য পর্যটনসেবার সাথে যুক্ত করা সম্ভব। স্থানীয় নারীদেরও খাবার, হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্য বিক্রির সাথে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।

স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পেশাদার পর্যটক গাইড হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। নৌযান পরিচালনার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের চরের ইতিহাস, নদীর বৈশিষ্ট্য, স্থানীয় সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে ধারণা দেয়ার ব্যবস্থা করা হলে এটি স্থানীয় তরুণদের জন্য স্থায়ী বা মৌসুমি আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে। ফলে পর্যটনের সুফল শুধু নগরকেন্দ্রিক না হয়ে চরাঞ্চলের মানুষের কাছেও পেঁৗঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে।

মিডল চরকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ। শহর থেকে চরে যাওয়ার পথ, নৌঘাঁট, নৌযানের নিরাপত্তা এবং মৌসুমি যাতায়াত-সবকিছুকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। শুধু পর্যটকদের চরে পৌঁছে দিলেই হবে না; পুরো যাত্রাটিকেই নিরাপদ ও আরামদায়ক করতে হবে। নৌঘাটে যাত্রী ওঠানামার নিরাপদ ব্যবস্থা, অপেক্ষার স্থান, ভাড়া বা টিকিট ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানের ব্যবস্থা থাকলে পর্যটন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আসবে।

ভবিষ্যতে পদ্মার তীর থেকে নৌপথে মিডল চর ভ্রমণ, চর ঘুরে দেখা এবং আবার নগরীতে ফিরে আসার মতো পরিকল্পিত পর্যটন প্যাকেজ চালু করা যেতে পারে। এর সাথে রাজশাহীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে যুক্ত করা গেলে একটি সমন্বিত পর্যটন সার্কিট তৈরি হতে পারে। এতে পর্যটকদের অবস্থানের সময় বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন, খাবার, নৌভ্রমণ, গাইড ও স্থানীয় পণ্যের ব্যবসাও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে পর্যটন উন্নয়নের ক্ষেত্রে চরবাসীর স্বার্থ রক্ষা করাও জরুরি। পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার নামে স্থানীয় মানুষের চলাচল, বসতি, কৃষিকাজ কিংবা জীবন-জীবিকায় যেন নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। চরবাসীকে উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশীদার করা গেলে তারা শুধু পর্যটন কেন্দ্রের সুবিধাভোগীই হবেন না; বরং এর ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখতে পারবেন। স্থানীয়দের গাইড, নৌযান চালক, উদ্যোক্তা ও পর্যটনসেবা প্রদানকারী হিসেবে গড়ে তোলা গেলে পর্যটনের সাথে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সরাসরি সম্পৃক্ততা তৈরি হবে।

এ সম্ভাবনাকে সামনে রেখে গত ২৮ আগস্ট পদ্মার মিডল চর পরিদর্শন করেছেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) প্রশাসক মো: মাহফুজুর রহমান রিটন এবং প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো: শাহজামান খান। পরিদর্শনকালে তারা চরটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদীতীরবর্তী পরিবেশ ও পর্যটনসহ বিভিন্ন সম্ভাবনার দিক ঘুরে দেখেন। একই সাথে চরের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে তাদের জীবনযাপন ও সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন এবং চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও এলাকার সম্ভাবনাকে কিভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে মতবিনিময় করেন।

পরিদর্শনের সময় পদ্মার মিডল চরকে রাজশাহীর পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আরো আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাব্য বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। তবে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে শুধু সৌন্দর্যনির্ভর পরিকল্পনা নয়, পরিবেশ, নদীর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।