বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আগামী তিন বছর সবচেয়ে বড় তিনটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে আসছে- উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিদেশী ঋণের ক্রমবর্ধমান পরিশোধ চাপ এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে আমদানি ব্যয় আরো বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতিকে নতুন করে উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
অন্য দিকে উন্নয়ন প্রকল্প ও বাজেট বাস্তবায়নে নেয়া বিদেশী ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপও দ্রুত বাড়ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট বিদেশী ঋণ দাঁড়িয়েছে সাত হাজার ৭২৮ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের আইডিএ (ওউঅ) এককভাবে মোট দেনার ২৯ শতাংশের অংশীদার।
ঋণ পরিশোধে বাড়ছে চাপ, বাড়ছে সুদের বোঝা : বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপ সামাল দেয়া।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, আগামী অর্থবছরেই শুধু সুদ পরিশোধে প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। তার মতে, ‘এটি বাজেটের ওপর ভয়াবহ চাপ তৈরি করবে। রাজস্ব আয় না বাড়লে ঋণনির্ভরতা থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।’
তিনি আরো মন্তব্য করেন, ‘বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি-সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে।’
বিদেশী ঋণের পরিসংখ্যান ও প্রবণতা
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত বিদেশী ঋণ ও সহায়তার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে ১৯ হাজার ৯৬৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। এর মধ্যে- অনুদান : তিন হাজার ৮৫৮ কোটি ডলার; ঋণ ও বাজেট সহায়তা : ১৬ হাজার ১০৬ কোটি ডলার। বিপরীতে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থছাড় পেয়েছে ১৪ হাজার ২২৫ কোটি ডলার, যার মধ্যে ঋণ অংশই ১১ হাজার ৪৭ কোটি ডলার।
বর্তমানে প্রায় চার হাজার ২০৯ কোটি ডলার এখনো পাইপলাইনে রয়েছে, যার বড় অংশই প্রকল্প ও বাজেট সহায়তার জন্য নির্ধারিত।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত, চীন, রাশিয়া ও জাপানের মতো বড় উন্নয়ন অংশীদাররা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন বড় প্রতিশ্রুতি না দিয়ে মূলত পূর্ববর্তী প্রকল্প থেকেই অর্থ ছাড় করছে।
বড় প্রকল্পে গ্রেস পিরিয়ড শেষ, চাপ বাড়ছে কিস্তিতে
অর্থনীতিবিদদের মতে, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং মেট্রোরেলসহ বড় প্রকল্পগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে এখন থেকে একযোগে আসল ও সুদ- দুটোই পরিশোধ করতে হবে।
এ কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই ঋণ পরিশোধের চাপ গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ কোটি ডলার বেশি হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী-২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে পরিশোধ : ৩২১ কোটি ডলার; ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে : ৩৫২ কোটি ডলার। এর মধ্যে শুধু সুদ বাবদই দিতে হয়েছে প্রায় ১২৫ কোটি ডলার।
আগামী পাঁচ বছরে ২৬ বিলিয়ন ডলার পরিশোধের চাপ
একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশকে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশী ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে- আসল : ১৮.৩৮ বিলিয়ন ডলার আর সুদ : ৭.৬ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই চাপ সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা বাজার, রিজার্ভ এবং বাজেট ভারসাম্যে প্রভাব ফেলবে।
‘ঋণের ফাঁদে পড়েছে বাংলাদেশ’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন ঋণের বড় ফাঁদে পড়েছে। আগামী তিন বছর সবচেয়ে কঠিন সময়।’
তিনি বলেন, গত এক দশকে ঋণ দ্রুত বেড়েছে- ‘২০১০ সালের আগে বিদেশী ঋণ ছিল প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার, এখন তা ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।’
তার মতে, বাজেটের বড় অংশ এখন ঋণ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। একই সাথে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিতভাবে না বাড়ায় পুরো অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, রফতানি ও রেমিট্যান্স কিছুটা বাড়লেও তা পর্যাপ্ত নয়। প্রয়োজনে রাষ্ট্রায়ত্ত ও অকার্যকর সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে ঋণ চাপ কমানোর পরামর্শ দেন তিনি।
মূল সঙ্কট : মূল্যস্ফীতি, ব্যয় ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা
ড. জাহিদ হোসেনের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক সঙ্কট হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে আমদানি ব্যয় বাড়ছে, যা মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘমেয়াদে উচ্চপর্যায়ে রাখতে পারে।
তিনি বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতি অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। আগামী দুই বছর বৈশ্বিক সঙ্কট পুরোপুরি কাটবে না।’ তার মতে, রিজার্ভে কিছুটা স্থিতিশীলতা থাকলেও আমদানি ব্যয় বাড়ায় চাপ অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয় না বাড়লে বাজেট ঘাটতি পূরণে ঋণনির্ভরতা আরো বাড়বে।
শেষ কথা-
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি মূল চ্যালেঞ্জ একসাথে কাজ করছে- উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ; বিদেশী ঋণের দ্রুত বাড়তে থাকা পরিশোধ চাপ এবং সরকারি ব্যয় ও অপচয় নিয়ন্ত্রণ।
এই তিনটি ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে আগামী কয়েক বছরে অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা আরো গভীর হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।



