ঢাবিতে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের নানা ভোগান্তি, বাস্তবায়ন হয়নি সুপারিশ

Printed Edition

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা চলাচল, আবাসন, অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম ও শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহারে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন। তাদের মধ্যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য পর্যাপ্ত ব্রেইল সাইনেজ ও নেভিগেশন সুবিধা নেই। অন্য দিকে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের অনেক ভবনে ঢুকতে হয় নানা বাধা পেরিয়ে। র‌্যাম্প, হ্যান্ডরেলসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে তাদের ভোগান্তি বেড়েই চলেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ভর্তি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে প্রতিবন্ধী কোটায় ১২০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭৮ জন শারীরিক প্রতিবন্ধী, ২৮ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং ১১ জন শ্রবণপ্রতিবন্ধী। তবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়ক পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা এখনো পর্যাপ্ত নয়।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী আবু ফারাজের অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতারই চিত্র তুলে ধরে। সম্প্রতি নির্ধারিত কক্ষ ২০৯-এর পরিবর্তে তাকে ২১১ নম্বর কক্ষে যেতে হয়। কিন্তু কক্ষটি খুঁজে পেতে তার সমস্যা হচ্ছিল। পরে অন্য এক শিক্ষার্থী তাকে কক্ষটি খুঁজে পেতে সহায়তা করেন।

ফারাজ বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি তাকে প্রায়ই হতে হয়। অনেক সময় চলাচলের পথে হোঁচট খেয়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। তার মতে, ক্যাম্পাসে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ও পর্যাপ্ত সুবিধা থাকা প্রয়োজন।

ফারাজ আরো বলেন, পুরো ক্যাম্পাসে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য মাত্র একটি নির্দিষ্ট ওয়াশরুম রয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় এটা পর্যাপ্ত নয়।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো শিক্ষাসামগ্রী ও প্রযুক্তির অভাব। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাবিকুন নাহার লিমা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে স্ক্রিন রিডার সফটওয়্যারযুক্ত কম্পিউটার, ব্রেইল প্রিন্টার কিংবা ডিজিটাল ভয়েস রেকর্ডারের মতো প্রয়োজনীয় সহায়ক প্রযুক্তি নেই। অনেক সময় পাঠ্যবই ও নোটের ব্রেইল বা অডিও সংস্করণও যথাসময়ে পাওয়া যায় না। ফলে তাদের অন্য শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভর করতে হয়।

লিমা বলেন, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল ম্যাপিং এবং ভয়েস-নির্দেশিত নেভিগেশন সুবিধা চালু করা দরকার। পরীক্ষার ক্ষেত্রেও তাদের স্ক্রাইব বা লেখকের ওপর নির্ভরশীল না করে টকিং কম্পিউটার বা সহায়ক সফটওয়্যার ব্যবহারের সুযোগ দেয়া উচিত।

প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের আবাসন নিয়েও রয়েছে নানা সমস্যা। ডাকসুর সদস্য রাইসুল ইসলাম বলেন, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের কখনো কখনো এমন কক্ষ দেয়া হয়, যেখানে থাকা তাদের জন্য কঠিন। অন্যদের সাথে কক্ষ ভাগ করে থাকার ক্ষেত্রেও নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়।

ক্যাম্পাসের চলাচলের পথেও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য সৃষ্টি হচ্ছে বাধা। বিভিন্ন স্থানে মোটরসাইকেল, সাইকেল, চেয়ার ও টেবিল এলোমেলোভাবে রেখে দেয়া হয়। ফলে চলাচলে সমস্যায় পড়েন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা।

এ দিকে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাসকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহজগম্য করতে গত ৭ জুলাই একগুচ্ছ সুপারিশ অনুমোদন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে ক্যাম্পাসের প্রধান সড়ক, ফুটপাথ ও গুরুত্বপূর্ণ চলাচলের পথে স্পর্শনির্ভর (ট্যাকটাইল) ব্যবস্থা চালু করা। এগুলো বাস্তবায়নে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাথে যোগাযোগের জন্যও বলা হয়েছে।

ক্যাম্পাসে রিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে প্রক্টর ও এস্টেট ম্যানেজারকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনে র‌্যাম্প নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

সুপারিশে আরো রয়েছে বিভিন্ন কক্ষ, বিভাগ, অফিস ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্রেইল সাইনেজ এবং অডিও নির্দেশনা চালু করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট, নোটিশ ও অনলাইন সেবাগুলোকে ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটি মানদণ্ডের আওতায় আনা।

এ ছাড়া প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক প্রযুক্তি, পড়াশোনায় প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং অ্যাকাডেমিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

জাতিসঙ্ঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক সনদের (ঈজচউ) ২৪ নম্বর অনুচ্ছেদে তাদের বৈষম্যহীন ও সমান ভিত্তিতে শিক্ষার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। ফলে দেশের অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও বাধামুক্ত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষার্থীদের দাবি, প্রশাসন ইতোমধ্যে যেসব সুপারিশ অনুমোদন করেছে, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা হোক। শুধু সুপারিশ অনুমোদন নয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলেই প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অনেকটা কমবে।