আসক-এর তথ্যচিত্র : ১ জানুয়ারি-২০ মে, ২০২৬
- শিশু ধর্ষণের শিকার : ১১৮ জন
- ধর্ষণচেষ্টার শিকার : ৪৬ জন
- ধর্ষণের পর হত্যা : ১৪ জন
- ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে খুন : ৩ জন
‘এই বিচার আপনারা করতে পারবেন না। স্ট্যাম্পে লিখিত নিবেন? কিছুদিন পর অন্য এক ঘটনায় এটি ধামাচাপা পড়ে যাবে। সর্বোচ্চ ১৫ দিন, এক মাস অথবা পাঁচ মাস; তারপর আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে আসামি কোনো না কোনোভাবে জামিনে বেরিয়ে আসবে।’- বিচার না পাওয়ার চরম সংশয় ও আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলেছেন অতি সম্প্রতি পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত শিশু রামিসার বাবা।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে ঘটে যাওয়া এমন অসংখ্য আলোচিত অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দ্রুত কার্যকর না হওয়ায় রামিসার মতো অবুঝ শিশুদের ওপর ধর্ষণ ও হত্যার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। অপরাধের এই লাগাম এখনই টেনে ধরা না গেলে ভবিষ্যতে সামাজিক সহিংসতা চরম আকার ধারণ করতে পারে।
৯০ শতাংশ শিশু ট্রমা নিয়ে বড় হচ্ছে : চাইল্ড হেল্পলাইন
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি চাইল্ড হেল্পলাইন (১০৯৮)-এ শিশু যৌন হয়রানি সংক্রান্ত পাঁচ হাজার ৮৫৩টি কল এসেছে। এর মধ্যে ৫২০টি কলই ছিল সরাসরি শিশু ধর্ষণের ঘটনা।
চাইল্ড হেল্পলাইনের ব্যবস্থাপক চৌধুরী মো: মোহায়মেন তার মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে জানান, আমাদের সমাজে প্রায় ৯০ শতাংশ শিশু কোনো না কোনোভাবে যৌন নিপীড়নের মানসিক আঘাত (ট্রমা) নিয়ে বড় হয়। ভয়ের বিষয় হলো, মেয়ে শিশুদের তুলনায় ছেলে শিশুরা বর্তমানে বেশি নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। আর এই নিপীড়কদের অধিকাংশটাই নিকট-আত্মীয় বা পরিবারের সদস্য।
পারিবারিক বন্ধনের শিথিলতা, পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার শর্টস বা রিলস দেখার ফলে মানুষের মধ্যে এক ধরনের তীব্র মানসিক বিকৃতি দেখা দিচ্ছে। চৌধুরী মোহায়মেন আরো বলেন, ‘সামাজিক দায়বদ্ধতা কমে যাওয়ায় শিশুর প্রতি স্বাভাবিক মানবিক আবেগ লোপ পাচ্ছে। মানুষ নেতিবাচক চর্চার মাধ্যমে জটিল ও বিকৃত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। ভিনদেশী সংস্কৃতির সহজলভ্যতা ও অবাধ প্রবেশাধিকারের কারণে যৌনচাহিদার ক্ষেত্রে মানুষের অবদমন বা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ভেঙে যাচ্ছে, যা সাইকোলজিক্যাল ট্রমা তৈরি করছে।’
পরিসংখ্যানের ভয়ঙ্কর চিত্র : শিশুরাই বেশি ঝুঁকিতে
দেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও সরকারি দফতরের পরিসংখ্যান বলছে, দেশের শিশু সুরক্ষার চিত্রটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ : ২০২৫ সালে দেশে ৬৩২ জন নারী হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। একই বছর ধর্ষণের শিকার হন ৭৮৬ জন নারী, যার মধ্যে ৫৪৩ জনই শিশু। অর্থাৎ, মোট ধর্ষণের প্রায় ৭০ শতাংশই শিশু। আর চলতি ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৭৮ জন নারী ও শিশু।
ডিএমপি ডাটা (এপ্রিল ২০২৬): শুধু ঢাকা মহানগরীতেই এক মাসে ৭০ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, নির্যাতনের শিকার ৯৮ জন এবং অপহৃত হয়েছেন ২১ জন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক): চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে চলতি মাসের প্রথম ২০ দিনেই (১-২০ মে) ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৪ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ শিশুকে এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে তিনজনকে। এ ছাড়া জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে খুন হয়েছে ১১৫ শিশু।
পুলিশ সদর দফতর : চলতি বছরের প্রথম চার মাসে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় পাঁচ হাজার ৯৫৮টি মামলা দায়ের হয়েছে।
আছিয়া হত্যার ১ বছর : বিচার কার্যকর হয়নি
‘আমার মেয়ের তো বুদ্ধিই হয়নি; কেবল সাত বছর পেরিয়ে আটে পা দিয়েছিল। অনেকে অনেক আন্দোলন করল, ছাত্রছাত্রীরা অনেক পরিশ্রম করছে আমার মনির জন্য, কিন্তু সেই পরিশ্রম বিফলে গেছে।’- কথাগুলো মাগুরায় ধর্ষণের শিকার হয়ে নিহত শিশু আছিয়ার মায়ের। এক বছর পেরিয়ে গেলেও বিচারিক প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে তার আর্তনাদ থামেনি।
গত বছর ৫ মার্চ রাতে বোনের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে বোনের শ্বশুর হিটু শেখের হাতে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয় শিশু আছিয়া। ঘটনার পর দ্রুততম সময়ে বিচার সম্পন্ন হলেও এক বছরেও কার্যকর করা যায়নি আসামি হিটু শেখের ফাঁসির রায়। অন্যদিকে, অপরাধের সহযোগী তিনজনকে আগেই বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত। মাগুরা শিশু ও নারী নির্যাতন দমন আদালতের বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম মুকুল জানান, মামলাটি উচ্চ আদালতে আপিলাধীন থাকায় এখনই আসামিকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো যাচ্ছে না। ভুক্তভোগী পরিবারের মতে, সাজা দ্রুত নিশ্চিত করা না গেলে শিশুদের ওপর এই পাশবিকতা বন্ধ করা সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও বিচারহীনতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের সমাজের গহিন গভীরে একটি নৈতিকতাহীন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগের দুই দশকের শাসনামলে এই অবস্থার চরম অবনতি ঘটেছিল, যেখানে ন্যায় ও সত্যের অবসান ঘটে। এর মূল কারণ ছিল প্রশ্নবিদ্ধ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সীমাহীন লোভ-লালসা। অপরাধীরা রাজনৈতিক উচ্চমহলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রশ্রয় পাওয়ায় পার পেয়ে গেছে। গত ১৭ মাস আগে সেই শাসনের অবসান ঘটলেও, অপরাধের সেই পুরনো ধারা এখন আবার নতুন আঙ্গিকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।’ ড. মাসুম আরো যোগ করেন, ‘রাজনৈতিক কর্তৃত্ব যখন পুলিশ প্রশাসনকে প্রভাবিত করে এবং বিচার বিভাগকে অবজ্ঞা করে, তখন সমাজে একটি প্রাতিষ্ঠানিক বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়। এটিই অপরাধীদের সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত করছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে প্রথাগত ধর্ষণ আইনের ফাঁকফোকর এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, যার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে।’
সমাধান কোন পথে?
অধিকারকর্মী ও আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে মামলার তুলনায় বিচারকের সংখ্যা অপ্রতুল হওয়ায় বিচারকার্যক্রম চলছে কচ্ছপগতিতে। অধস্তন আদালতে অপরাধী প্রমাণিত হওয়ার পরও উচ্চ আদালত এবং পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে চূড়ান্ত রায় কার্যকর হতে বছরের পর বছর লেগে যাচ্ছে। এই দীর্ঘসূত্রতা অপরাধপ্রবণতা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জরুরি ভিত্তিতে নি¤œ আদালতে অন্তত ২০ জন অতিরিক্ত বিচারক এবং উচ্চ ও সর্বোচ্চ আদালতে ১০০ জন নতুন বিচারক নিয়োগ দিয়ে দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির ট্রাইব্যুনালগুলোকে কার্যকর করার জোর দাবি জানিয়েছেন।



