নিজস্ব প্রতিবেদক
আবারো মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে বাংলাদেশ। এবার ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনিতে। রিখটার স্কেলে এই ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫.৪। দক্ষিণের জেলা সাতক্ষীরায় উৎপত্তিস্থল হলেও ঢাকাতেও বেশ জোরেশোরে কম্পন অনুভূত হয়েছে। সংবাদদাতারা জানিয়েছেন, সাতক্ষীরার বাড়িঘরগুলো প্রচণ্ডভাবে দুলে উঠে। মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হলেও ক্ষয়ক্ষতি তেমন হয়নি। রাত পর্যন্ত কারো আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। ভূমিকম্পের উৎপত্তি স্থল ঢাকার ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র থেকে ১৮৮ দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে। এটা ছাড়াও গত বৃহস্পতিবার ভারতের সিকিম রাজ্যে পরপর দুইটি ভূমিকম্প ঘটে গেছে যার কম্পন বাংলাদেশ থেকেও অনুভূত হয়। এর আগে গত সপ্তাহে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে আরেকটি ভূমিকম্প হয়ে গেল, সেটাও বাংলাদেশ থেকে অনুভূত হয়।
বাংলাদেশ ভূমিকম্প প্রবণতার দিক থেকে একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। বাংলাদেশ সক্রিয় টেকটোনিক প্লেট সংঘর্ষ অঞ্চলে অবস্থিত ভারতীয় প্লেট, ইউরেশীয় প্লেট ও বার্মা প্লেটের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান। এই টেকটোনিক প্লেটগুলোতে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ হচ্ছে। উত্তরে হিমালয় অঞ্চল এবং পূর্বে মিয়ানমারের আরাকান ট্রেঞ্চ ভূমিকম্পের প্রধান উৎস। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের সাবডাকশন জোনও মাঝেমধ্যে ভূমিকম্প সৃষ্টি করে।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, সাতক্ষীরায় প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বেলা ১টা ৫২ মিনিটে এ ভূমিকম্প অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪। ভূমিকম্পের ফলে সাতক্ষীরা শহরের পাকা বাড়িঘর কেঁপে ওঠে। এ সময় ঘরের আসবাবপত্র ও সিলিং ফ্যানসহ অন্যান্য জিনিসপত্র কাঁপতে থাকে। এতে অনেক মানুষজন ভয়ে ঘর থেকে বাইরে বের হয়ে পড়ে। হঠাৎ ভূমিকম্পের ঘটনায় মানুষের মাঝে অতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এ দিকে এ ঘটনায় কোথাও বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে উপকূলীয় কালিগঞ্জ উপজেলায় কয়েক জনের বিল্ডিংয়ের ছাদে ফাঁটল ধরার খবর পাওয়া গেছে। পাটকেলঘাটা থানার নগরঘাটা গ্রামের কয়েকটি মাটির ঘরের টালি ভেঙে পড়েছে। সদর উপজেলার ঝাউডাঙ্গা মহাশশ্মানের প্রাচীর ভেঙে পড়েছে। ফাটল দেখা দিয়েছে মন্দিরে। এ ছাড়া ভূমিকম্পের সময় অনেকের বাড়ির গ্যাসের চুলা ও আসবাবপত্র ভেঙে পড়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
ঘটনার পরপরই লোকজন ফোন করে নিকট আত্মীয়দের খোঁজখবর নিতে শুরু করেন যে, ভূমিকম্পের ফলে কারো কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না। ভূমিকম্পের সময় সাতক্ষীরার কলারোয়ার একটি মার্কেটে থাকা ক্রেতারা ভয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। ভূমিকম্পের সময় শ্যামনগর উপজেলা উত্তর হাজিপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের মুসল্লিরা নামাজরত অবস্থায় কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা জানমাল রক্ষায় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন।
আশাশুনির খাজরা গ্রামের বাসিন্দা কৃষ্ণ ব্যানার্জি জানান, ভূমিকম্পে তার দোতলা বাড়ির দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। ভূমিকম্পের সময় তাদের এলাকায় অনেকেই দ্রুত ঘর থেকে বাইরে চলে আসেন।
কালিগঞ্জের মৌতলা গ্রামের মুন্সি মাহমুদুল হক ওরফে মধু জানান, প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে তার একতলা ভবনের ছাদে বেশ কয়েকটি স্থানে ফাঁটল দেখা দিয়েছে। এ সময় তার পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। দ্রুত তারা সবাই ঘরের বাইরে চলে আসেন।
আশাশুনির বিছট গ্রামর স্কুলশিক্ষক আবু দাউদ জানান, জুমার নামাজ শেষে আমরা বেশ কিছু মুসল্লি মসজিদে বসে ছিলাম। হঠাৎ প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে ভূমিকম্পের ফলে মসজিদ ঘর কেঁপে উঠে। এ সময় ভয়ে অনেক মসজিদ থেকে দ্রুত বেরিয়ে যান। তিনি বলেন, আমার জীবদ্দশায় এ রকম ভূমিকম্পন আমাদের এই এলাকায় আর কখনো অনুভূত হয়নি।
আশাশুনির মাদিয়া গ্রামের সন্তোষ কুমার জানান, আশাশুনি থানার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় হঠাৎ করে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি অনুভব করি। এ সময় থানার ভেতরে থাকা পুলিশ সদস্যরা ভয়ে দ্রুত বাইরে চলে আসেন।
আনুলিয়া ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার জানান, জুমার নামাজ আদায় করতে মসজিদে থাকা অবস্থায় প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এ সময় মসজিদের মুসল্লিরা ভয়ে অনেকে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে যান। তিনি বলেন, এর আগে কখনো এই অঞ্চলে এত জোরে ভূমিকম্পন অনুভূত হয়নি। হঠাৎ ভূমিকম্পনের ফলে গ্রামের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে ঘর ছেড়ে বাইরে চলে আসেন।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আতঙ্কিত না হয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
সাতক্ষীরা প্রথম শ্রেণীর আবহাওয়া অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন বলেন, সাতক্ষীরায় ৫ দশমিক ৪ মাত্রায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরা জেলাজুড়ে।
খুলনায় মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প
খুলনা ব্যুরো জানায়, খুলনায় গতকাল শুক্রবার বেলা ১টা ৫৩ মিনিটের সময় মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এতে মানুষ চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। অনেকে আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে। তবে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
গতকাল যখন জমিন কেঁপে ওঠে তখন প্রায় মসজিদেই জুমার নামাজের পর মুনাজাত চলছিল। ভূমিকম্প হওয়ায় মুসল্লিদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
খুলনা আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়া কর্মকর্তা মো: মিজানুর রহমান বলেন, খুলনায় মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প হয়েছে। যার মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭ ।



