নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্প খাত স্টিল শিল্প রক্ষায় বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি পুনর্বিবেচনা ও তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ)। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত অদক্ষতা ও ক্যাপাসিটি চার্জের আর্থিক বোঝা উৎপাদনশীল শিল্প খাতের ওপর চাপিয়ে দেয়া কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না।
বিএসএমএর সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম সংবাদ সম্মেলনে সম্প্রতি ঘোষিত বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এই দাবি জানান। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের স্টিল শিল্প যখন ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সঙ্কটকাল অতিক্রম করছে, ঠিক তখনই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।
বক্তব্যে বলা হয়, বর্তমানে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগসমৃদ্ধ এই খাতটি বহুমাত্রিক সঙ্কটের মুখোমুখি। নির্মাণ খাতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা, বাজারে চাহিদা হ্রাস, উচ্চ সুদহার, টাকার অবমূল্যায়ন, ডলার সঙ্কট, এলসি খোলায় জটিলতা, কার্যকর মূলধনের ঘাটতি, গ্যাস সরবরাহ সঙ্কট এবং ক্রমবর্ধমান লজিস্টিক ব্যয়ের কারণে কারখানাগুলোর টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪০টি আধুনিক স্টিল মিল এবং ১৫০টিরও বেশি রি-রোলিং মিল রয়েছে, যাদের সম্মিলিত উৎপাদনসক্ষমতা বছরে প্রায় ১২.২ মিলিয়ন মেট্রিক টন। অথচ দেশে বর্তমান বার্ষিক চাহিদা মাত্র পাঁচ মিলিয়ন মেট্রিক টন। ফলে অধিকাংশ কারখানা তাদের উৎপাদনসক্ষমতার ৫০ শতাংশের কম ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে।
বিএসএমএ জানায়, বিদ্যুতের নতুন ট্যারিফের কারণে প্রতি মেট্রিক টন স্টিল উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১,৭৮৫ টাকা বৃদ্ধি পাবে। এর সাথে ভ্যাট, বন্দর চার্জ, জ্বালানি ও অন্যান্য ব্যয়ের প্রভাব যুক্ত হয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রতি মেট্রিক টনে প্রায় ৩,৫৬০ টাকায় পৌঁছাতে পারে।
বিএসএমএ সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘দেশের মোট স্টিল ব্যবহারের প্রায় ৬০ শতাংশ বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়। ফলে স্টিলের উৎপাদনব্যয় বৃদ্ধি পেলে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যয়ও সরাসরি বেড়ে যাবে। অর্থাৎ বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে শেষ পর্যন্ত সরকারকেই উন্নয়ন প্রকল্পে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে।’
সংগঠনটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে, দেশের বৃহৎ স্টিল কারখানাগুলো ৩৩ কেভি, ১৩২ কেভি এবং ২৩০ কেভি হাই ও এক্সট্রা হাই ভোল্টেজ লাইনের সরাসরি গ্রাহক। নিজস্ব অর্থায়নে সাবস্টেশন ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণ করায় এসব গ্রাহকের ক্ষেত্রে কোনো উল্লেখযোগ্য সিস্টেম লস বা ট্রান্সমিশন লস নেই। তা সত্ত্বেও ডিমান্ড চার্জ, পাওয়ার ফ্যাক্টর চার্জ ও ভ্যাটের মাধ্যমে শিল্প খাতের ওপর ক্রমাগত অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপানো হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বিএসএমএ সতর্ক করে বলেছে, এই বাড়তি খরচের কারণে শিল্প উৎপাদন কমবে, নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় তিন লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়বে।
দেশের শিল্প, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করে পূর্ববর্তী মূল্যহার পুনর্বহাল করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এবং নীতিনির্ধারকদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।



