ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনি নারীদের ওপর ‘নীরব গণহত্যা’

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনি নারী বন্দীদের ওপর নির্যাতন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; ফিলিস্তিনি বন্দী সমিতির দাবি, এটি এখন একটি পরিকল্পিত নীতিতে পরিণত হয়েছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির।

সমিতিটির দেয়া সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে কেবল দামোন কারাগারের নারী ব্লকেই অন্তত ১০টি পৃথক অভিযান চালিয়েছে ইসরাইলি কারা বাহিনী। এই অভিযানগুলোতে নারী বন্দীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের চরম সীমা লঙ্ঘন করার অভিযোগ উঠেছে। ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, বর্তমানে ৯ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি ইসরাইলি কারাগারে বন্দী রয়েছেন। এর মধ্যে ৮৮ জন নারী বন্দীর অধিকাংশকে দামোন কারাগারে। বাকিরা আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্রে রয়েছে। ফিলিস্তিনি বন্দী সমিতি বলছে, বেশিরভাগ নারী বন্দীকে কথিত ‘উসকানি’ অথবা ‘গোপন ফাইলের’ ভিত্তিতে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই প্রশাসনিক আটকাদেশে কারাবন্দী করা হয়েছে।

সম্প্রতি দামোন কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া নারীদের বেশ কয়েকজনের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। তারা জানিয়েছেন, অভিযানের সময় পুরুষ ও নারী কারারক্ষীরা বন্দীদের নির্যাতন চালায়। তাদের মারধর করে মাটিতে শুইয়ে রাখা এবং পিঠের পেছনে হাতকড়া পরিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেলে রাখা হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, ২০২৩ সাল থেকে ‘নগ্ন তল্লাশি’ একটি নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক নিয়মে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে হাশারোন থেকে দামোন কারাগারে স্থানান্তরের সময় নারীদের চরম অপমানজনক ও যৌন নিপীড়নমূলক তল্লাশির শিকার হতে হয়।

এক বিবৃতিতে বন্দী সমিতি জানায়, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ বন্দীদের বিরুদ্ধে অনাহার নীতি কার্যকর করছে। খাবারের অভাবে একজন বন্দী মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে প্রায় ৩০ কেজি ওজন হারিয়েছেন। বিশেষ করে ইসরাইলি ছুটির দিনগুলোতে এই খাদ্য সঙ্কট আরো তীব্র করা হয়। এ ছাড়া সেলের ভেতর মারাত্মক ভিড় থাকায় একটি ছোট ঘরে ১০ জনেরও বেশি নারীকে রাখা হচ্ছে, যার ফলে অনেককে স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে ঘুমাতে হচ্ছে। বন্দীদের মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে এবং তিনজন গর্ভবতী নারীও আছেন। এমনকি ক্যান্সারে আক্রান্ত দু’জন নারীকেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে না।

পিএলও-র বন্দী বিষয়ক কমিশনের প্রধান রায়েদ আবু আল-হুমুস এই পরিস্থিতিকে একটি ‘নীরব গণহত্যা’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, পরিকল্পিতভাবে চিকিৎসাসেবা বন্ধ রাখা, নির্জন কারাবাস এবং নিয়মিত মারধর করে বন্দীদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৯,৪০০ ফিলিস্তিনি ইসরাইলি কারাগারে বন্দী রয়েছেন, যাদের জীবন এখন চরম ঝুঁকির মুখে। ফিলিস্তিনি বন্দী গোষ্ঠীগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অবিলম্বে এই ‘সংগঠিত অপরাধ’ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সাথে অসুস্থ, গর্ভবতী ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের মুক্তি দেয়ার দাবি করেছে।

গাজায় নিহত বেড়ে ৭২,৭৪০

অবরুদ্ধ গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭২ হাজার ৭৪০ জনে দাঁড়িয়েছে। খবর মিডল ইস্ট আই-এর।

ফিলিস্তিনের ওয়াফা সংবাদ সংস্থা চিকিৎসা সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলের হাতে নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা বেড়ে ৭২ হাজার ৭৪০ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন আরো এক লাখ ৭২ হাজার ১৯২ জন। সূত্রগুলো জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় গাজার হাসপাতালগুলোতে তিনজনের লাশ এবং আরো ১৬ জন আহতকে আনা হয়েছে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে তথাকথিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইল প্রায় ৮৫৪ জনকে হত্যা করেছে এবং আরো দুই হাজার ৪৫৩ জনকে আহত করেছে। এ ছাড়া ধ্বংসস্তূপ থেকে ৭৭০টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে । এদিকে আনাদোলু জানায়, গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরাইলি বাহিনীর গুলিবর্ষণে অন্তত দুই ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। সোমবার সকালে গাজার উত্তরাঞ্চল ও গাজা শহরে পৃথক দুই ঘটনায় এ হতাহতের ঘটনা ঘটে বলে চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় ইসরাইলি সেনারা গুলি চালালে এক ফিলিস্তিনি মাঝারি ধরনের আহত হন। পরে তাকে গাজা শহরের আল-শিফা হাসপাতালে নেয়া হয়। একই সময়ে গাজা শহরের কেন্দ্রীয় সামের মোড় এলাকায় আরেক তরুণ গুলিবিদ্ধ হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ইসরাইলি সেনা নিয়ন্ত্রিত সীমার কাছাকাছি অবস্থান করা সামরিক যান থেকে ওই গুলি ছোড়া হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সোমবার ভোরে গাজা শহরের পূর্বাঞ্চলে শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। পরে জানা যায়, ইসরাইলি বাহিনী সেখানে বিস্ফোরণের মাধ্যমে স্থাপনা ধ্বংস করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় গোলাবর্ষণও করা হয়। দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনুসেও সামরিক যান ও নৌযান থেকে গুলি ছোড়ার খবর পাওয়া গেছে।

যুদ্ধের প্রভাবে বিপর্যস্ত গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা

গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন ‘সশস্ত্র সংঘাতের বলি’তে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন রাফায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) মুখপাত্র প্যাট গ্রিফিথস।

তিনি বলেন, অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় হাসপাতালগুলো আর স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে না। বহু হাসপাতালের দেয়ালে গুলির দাগ দেখা যাচ্ছে। কিছু ভবন বিস্ফোরণের আঘাতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্রিফিথস জানান, গত বছরের অক্টোবরের পর ঘোষিত যুদ্ধবিরতিতে পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। তার মতে, একসাথে এখন বহু হতাহতের মতো বড় ধরনের ঘটনা কিছুটা কম দেখা যাচ্ছে। তবে এর মানে এই নয় যে হামলা বন্ধ হয়ে গেছে। প্রাণঘাতী ঘটনা এখনো নিয়মিতই ঘটছে। তিনি আরো একটি ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। এক সার্জনের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ওই চিকিৎসক মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়া এক শিশুর চিকিৎসা করছিলেন। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে শিশুটি তার হাতের ওপরই মারা যায়। গ্রিফিথস বলেন, এ ধরনের ঘটনা চিকিৎসকদের মানসিকভাবে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এসব অভিজ্ঞতা সহজে ভুলে যাওয়া যায় না। তিনি আরো বলেন, গাজায় ফিলিস্তিনিদের জন্য প্রতিদিনই মৃত্যু ও ধ্বংসের বাস্তবতা চলমান। স্বাস্থ্যব্যবস্থা, হাসপাতাল এবং চিকিৎসকরা এই পরিস্থিতিতে চরম চাপের মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

ধ্বংসস্তূপের নিচে ৮ হাজার লাশ, বন্ধ উদ্ধার কার্যক্রম

গাজা উপত্যকায় ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অন্তত আট হাজার ফিলিস্তিনি চাপা পড়ে রয়েছে। তবে উদ্ধার সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে সেগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল।

গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসসাল বলেন, বর্তমানে যে সরঞ্জাম রয়েছে তা অত্যন্ত পুরনো এবং ইসরায়েলি বাহিনীর দুই বছরের সামরিক অভিযানে সৃষ্ট ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ মোকাবেলা তথা সরানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়।

তিনি বলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া লাশের সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। প্রতিদিনই নতুন নতুন নিখোঁজ ব্যক্তির নাম সামনে আসছে। তবে ধ্বংসস্তূপ সরাতে উপযোগী ভারী যন্ত্রপাতি গাজায় প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না ইসরাইল। জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় এখনো ছয় কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টনের বেশি ধ্বংসস্তূপ রয়ে গেছে যার মাত্র ১ শতাংশ এখন পর্যন্ত অপসারণ করা হয়েছে।

ইসরাইলি বিমান হামলা, স্থলযুদ্ধ এবং নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের ফলে গাজায় এক লাখ ২৩ হাজারের বেশি ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এবং আরো ৭৫ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটি গাজা উপত্যকার মোট স্থাপনার প্রায় ৮১ শতাংশ।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক হিসাব অনুযায়ী, পুরো গাজা পরিষ্কার করতে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি ব্যয় হতে পারে।

পুলিশ বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ হামাসের

গাজায় আইনশৃঙ্খলা ভেঙে বিশৃঙ্খলা তৈরির উদ্দেশ্যে ইসরাইল পরিকল্পিতভাবে পুলিশ ও নিরাপত্তা সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে হামাস। খান ইউনুসে এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার নিহত হওয়ার পর রোববার এক বিবৃতিতে এ অভিযোগ তোলে সংগঠনটি। খবর আনাদোলু এজেন্সির।

হামাস জানায়, খান ইউনুসের অপরাধ তদন্ত বিভাগের প্রধান ওয়াসসাম আবদেল হাদি ও তার সহযোগী ফাদি হাইকালের গাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরাইলি বাহিনী। এতে তারা নিহত হন। গাজার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

বিবৃতিতে হামাস দাবি করে, গাজার বেসামরিক প্রশাসন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ধ্বংস করার অংশ হিসেবেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে। সংগঠনটি বলেছে, যুদ্ধবিরতির পর সাধারণ জীবন ফিরিয়ে আনার যে চেষ্টা চলছে, ইসরাইল তা ব্যাহত করতে চায়।

হামাস আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী ও যুদ্ধবিরতির গ্যারান্টিদাতা দেশগুলোর প্রতি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় ৮৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। সংগঠনটির দাবি, ইসরাইল প্রতিনিয়ত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে এবং নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে।

এদিকে গাজায় অস্ত্র সমর্পণ ইস্যু নিয়ে চলমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই ইসরাইলি বাহিনী পুলিশ ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর হামলা জোরদার করেছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।