আবুল কাশেম শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলায় করতোয়া নদীর তীরে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানাগুলোর বিষাক্ত বর্জ্যে মারাত্মক দূষণের শিকার হয়েছে নদীটি। আর এই দূষিত পানির সংস্পর্শে এসে নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোর শতাধিক মানুষ চর্মরোগসহ নানা ধরনের পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। আক্রান্তদের মধ্যে কয়েকজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
সরেজমিন জানা গেছে, উপজেলার পোতাজিয়া ইউনিয়নের গঙ্গাপ্রসাদ গ্রাম ও হাবিবুল্লাহ নগর ইউনিয়নের দরগারচর নতুনপাড়া গ্রামে বেশ কয়েকটি প্রসেস মিল গড়ে উঠেছে। এসব মিলে সুতা রঙ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। আর সেই বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি পাইপের মাধ্যমে ফেলা হচ্ছে করতোয়া নদীতে। কোনো ধরনের পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই পরিচালিত এসব শিল্পকারখানায় পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) না থাকায় সব বর্জ্য পড়ছে নদীতে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শিল্পবর্জ্যে নদীর পানি তার নিজস্ব রঙ হারিয়ে কালো বর্ণ ধারণ করেছে। সেই বিষাক্ত পানিতে গোসল করতেই তাদের শরীরে ঘা-পাঁচড়া, চুলকানি, জ্বর ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দিয়েছে। গঙ্গাপ্রসাদ গ্রামের বাসিন্দা আবদুল জলিল বলেন, বাধ্য হয়ে আমরা এই নদীর পানিতে গোসল করি। এখন শরীরে চুলকানি ও ঘা হয়েছে। অনেকের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে।
দরগারচর নতুনপাড়া গ্রামের বাসিন্দা নুরজাহান বেগম জানান, তার দুই সন্তানের গায়ে ঘা হয়েছে। স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি বলেন, কারখানার পানি নদীতে পড়ছে, আমরা কী করে বাঁচব? প্রশাসনের কিছু করা উচিত।
শুধু মানুষের স্বাস্থ্যই নয়, দূষণের কারণে নদীর মাছও মরে যাচ্ছে বলে অভিযোগ জেলেদের। করতোয়া নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা জেলে শফিকুল ইসলাম বলেন, আগে নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন বিষাক্ত পানিতে মাছ মরে ভেসে উঠছে। আমরা জাল ফেলতে ও পারছি না।
অভিযোগ রয়েছে, শিল্পকারখানাগুলোর প্রভাবশালী মালিকরা নদীর তীরবর্তী সরকারি জায়গাও দখল করে নিয়েছে। নিয়মিত পরিবেশ দূষণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অভিযোগকারীরা।
শাহজাদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা: আসিফ ইকবাল জানান, দূষিত পানি ও পরিবেশের কারণে চর্মরোগ ও পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে কয়েকজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীম হাসান জানান, নদীদূষণের বিষয়টি জানতে পেরেছেন। পরিবেশ অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট দফতরকে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
পরিবেশ অধিদফতর, সিরাজগঞ্জের সহকারী পরিচালক মো: ফরিদুল ইসলাম জানান, সংবাদ পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসী জরুরি ভিত্তিতে দূষণের জন্য দায়ী শিল্পকারখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও নদীদূষণ রোধে স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।


